শিক্ষার্থীর সুস্থতা: গভীর ও টেকসই শিক্ষার ভিত্তি হিসেবে নতুন শিক্ষাগত কাঠামো
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova
২০২৬ সালের মধ্যে কর্মক্ষমতা-কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অত্যধিক সংযুক্তির কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্বেগজনক মানসিক স্বাস্থ্য সংকট বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীর সুস্থতাকে একটি মৌলিক জ্ঞানীয় অবকাঠামো হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশলগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ, বর্তমানে সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করছে, যার ফলস্বরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সহায়ক পরিষেবাগুলির পরিধি বৃদ্ধি করতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনেস্কো দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করে যে মানসিক সুস্থতা শিক্ষার একটি সহায়ক উপাদান নয়, বরং এটি শিক্ষার একটি সক্ষমকারী শর্ত। বাংলাদেশেও পরীক্ষার চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারা এবং নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারার কারণে হতাশা ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে, যার ৬১ শতাংশই ছিল নারী। এই দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সরাসরিভাবে কার্যকরি স্মৃতি এবং মনোযোগের মতো মূল জ্ঞানীয় কার্যাবলীতে হস্তক্ষেপ করে, যা দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে।
সামাজিক-আবেগিক শিক্ষা বা SEL দক্ষতার একীকরণ কেবল আবেগিক ও সামাজিক ক্ষমতা বৃদ্ধি করে না, এটি শিক্ষাগত পারফরম্যান্সের উন্নতিতেও উল্লেখযোগ্যভাবে সহায়তা করে, যা ডারল্যাক এবং তার সহযোগীদের মেটা-বিশ্লেষণ দ্বারা সমর্থিত। এই রূপান্তর একটি মানব-কেন্দ্রিক শাসনের দাবি রাখে, যেখানে সুস্থতার নীতি শিক্ষণ পদ্ধতিকে পরিচালিত করবে। একই সাথে, শিক্ষক সুস্থতাকেও শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ওইসিডি লার্নিং কম্পাস ২০৩০ শিক্ষাকে 'শিক্ষার্থীর সুস্থতা' ধারণার চারপাশে কেন্দ্র করে সাজানোর প্রস্তাব করে, যেখানে সাফল্যের পরিমাপ কেবল কর্মক্ষমতার বাইরে গিয়ে সংজ্ঞায়িত হবে।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি; উদাহরণস্বরূপ, নর্ডিক দেশগুলিতে 'হোল-স্কুল সুস্থতা' কর্মসূচি প্রচলিত আছে, যেখানে শিক্ষাদান, মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং SEL শিক্ষাকে সমন্বিত করা হয়। বাংলাদেশেও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের মতো বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করা অপরিহার্য, কারণ শিক্ষকদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা গঠনে প্রভাব ফেলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে না পারা, একাকিত্ব, পড়াশোনার খরচ এবং চাকরির অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ বাড়ায়, যা অনেক সময় মাদক গ্রহণ বা অসামাজিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ার কারণ হতে পারে। বিদ্যমান ভর্তি পরীক্ষার 'ফ্রি-ফর-অল' ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সমন্বিত, র্যাংকিংভিত্তিক স্বচ্ছ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের উপর থেকে একাধিক পরীক্ষার মানসিক ক্লান্তি দূর করে মূল একাডেমিক মূল্যায়নে মনোযোগ দিতে সাহায্য করবে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে এবং মানসিক রোগকে এখনও সামাজিক কুসংস্কারের কারণে লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা উভয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ, যেমনটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংজ্ঞায়িত করেছে, যেখানে স্বাস্থ্য বলতে শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকাকে বোঝায়। সাইবার বুলিংও বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একটি বড় কারণ, যার জন্য সহনশীলতা এবং অন্যের চিন্তাভাবনাকে সম্মান করা জরুরি। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করে যে শিক্ষা কেবল জ্ঞান বিতরণ নয়, বরং এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা শিক্ষার্থীদের স্থিতিস্থাপকতা এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সহায়তা করে।
6 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Agenda Digitale
UNESCO
PubMed
OECD
ResearchGate
OECD
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।