শিক্ষায় শিল্পের উদ্ভাবনী প্রয়োগ: গ্লোবাল টিচার প্রাইজ জিতলেন ভারতীয় শিক্ষাবিদ রুবল নাগি
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova
২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার, দুবাইয়ে আয়োজিত ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্টস সামিটে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ভারতীয় শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী রুবল নাগিকে মর্যাদাপূর্ণ 'গ্লোবাল টিচার প্রাইজ' প্রদান করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতা ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে তাকে ১০ লক্ষ মার্কিন ডলার পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা তাকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
গত দুই দশক ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন রুবল নাগি। তার প্রতিষ্ঠিত 'রুবল নাগি আর্ট ফাউন্ডেশন' (RNAF) সমগ্র ভারতজুড়ে ৮০০-এরও বেশি শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেছে। এই কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে যারা কোনোদিন স্কুলে যায়নি এমন শিশুদের যেমন পাঠদান করা হয়, তেমনি নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতেও বিশেষ সহায়তা প্রদান করা হয়।
রুবল নাগির শিক্ষাদান পদ্ধতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো 'লিভিং ওয়ালস অফ নলেজ' বা 'জ্ঞানের জীবন্ত দেয়াল'। তিনি বিভিন্ন জনবসতির দেয়ালে শিক্ষামূলক ম্যুরাল বা দেয়ালচিত্র আঁকেন, যা মূলত উন্মুক্ত শ্রেণিকক্ষ হিসেবে কাজ করে। এই চিত্রগুলোর মাধ্যমে বিজ্ঞান, গণিত, ইতিহাস এবং সাক্ষরতার পাঠ অত্যন্ত সহজভাবে শিশুদের সামনে তুলে ধরা হয়। তার 'মিসাল ইন্ডিয়া' উদ্যোগটি বস্তি ও গ্রামের প্রায় ১০ লক্ষাধিক শিশুর কাছে পৌঁছেছে, যেখানে পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি জীবনমুখী দক্ষতা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।
এই বহুমুখী পদ্ধতির প্রভাবে লক্ষ্যভুক্ত এলাকাগুলোতে স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার ৫০ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। একই সাথে শিশুদের মধ্যে অক্ষরজ্ঞান ও গাণিতিক দক্ষতায় ব্যাপক উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ ২৪ বছর আগে মাত্র ৩০ জন শিশুকে নিয়ে একটি ছোট কর্মশালার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যাত্রা আজ এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০১৫ সালে ভার্কি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রবর্তিত এই গ্লোবাল টিচার প্রাইজ প্রতি বছর এমন শিক্ষকদের সম্মানিত করে যারা সমাজ ও শিক্ষার্থীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেন; রুবল নাগি এই পুরস্কারের দশম বিজয়ী।
ভার্কি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সানি ভার্কি রুবল নাগির সাহস, সৃজনশীলতা এবং সহমর্মিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ আল মাকতুমের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে নাগি তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি এই ১০ লক্ষ ডলার পুরস্কারের অর্থ দিয়ে একটি বিশেষ ইনস্টিটিউট গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে প্রান্তিক যুবকদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পেশাদার বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
শিক্ষার পাশাপাশি নগর উন্নয়নেও রুবল নাগির অবদান অনস্বীকার্য। তার 'মিসাল মুম্বাই' প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের প্রথম বস্তি এলাকা রাঙিয়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার অধীনে ১৬৩টিরও বেশি বস্তি ও গ্রামের প্রায় ১,৫৫,০০০ বাড়ি সংস্কার ও রঞ্জিত করা হয়েছে। এই প্রকল্পের সাথে প্রায়ই স্বাস্থ্যবিধি সচেতনতা কর্মশালাও যুক্ত থাকে। এছাড়া ইন্ডিয়া ডিজাইন কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে ২০১৭ সালে তিনি প্রথম শিল্পী হিসেবে নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন মিউজিয়ামে তার শিল্পকর্ম প্রদর্শনের আমন্ত্রণ পান। তার এই কর্মযজ্ঞ প্রমাণ করে যে, সামাজিক উদ্ভাবন কেবল শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়।
9 দৃশ্য
উৎসসমূহ
WDIV
WSLS 10
The Arabian Stories
The Economic Times
PTI
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।