মার্কিন ভূ-রাজনৈতিক আর্থিক চাপের মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সার্বভৌম ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ত্বরান্বিতকরণ
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ইউরোপীয় মহাদেশ বর্তমানে এক ক্রমবর্ধমান আর্থিক ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে, যার মূল কারণ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীভূত আর্থিক পরিষেবাগুলোর ওপর তাদের ব্যাপক নির্ভরতা। এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) তাদের নিজস্ব সার্বভৌম ডিজিটাল পেমেন্ট সরঞ্জামগুলোর উন্নয়নে গতি বাড়াতে বাধ্য করছে। বিশেষ করে 'ডিজিটাল ইউরো' এবং 'Wero' (যা ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে ইউরোপের প্রধান ব্যাংকগুলো দ্বারা চালু করা হয়েছে) ব্যবস্থার মাধ্যমে ইইউ তার মুদ্রাগত স্বায়ত্তশাসন বা মনেটারি অটোনমি অর্জনের চেষ্টা করছে। মার্কিন আর্থিক নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রয়োগের নজির এবং ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাজারে বিদেশি কার্ড নেটওয়ার্কগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য এই স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জরুরি করে তুলেছে।
মার্কিন নিয়ন্ত্রিত আর্থিক ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ব্লক বা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঝুঁকি কতটা বাস্তব হতে পারে, তার একটি বড় প্রমাণ পাওয়া যায় ২০২৫ সালের একটি ঘটনায়। সেই বছরের আগস্ট মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষেধাজ্ঞা জারির পর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারক নিকোলা গুইউ (Nicolas Guillou) হঠাৎ করেই সমস্ত ডিজিটাল আর্থিক পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তার ভাষ্যমতে, এই নিষেধাজ্ঞা তার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো দিককেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করেছিল। পরিসংখ্যানগত তথ্যও ইউরোপের এই নাজুক পরিস্থিতির সাক্ষ্য দেয়: বর্তমানে ইউরোপের ডিজিটাল পেমেন্ট সেক্টরের কিছু ক্ষেত্রে ভিসা (Visa) এবং মাস্টারকার্ড (Mastercard) প্রতি ১০টি কার্ড লেনদেনের মধ্যে ৭টিই সম্পন্ন করে, যার সম্পূর্ণ অবকাঠামো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত এবং ইইউ-এর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) ডিজিটাল ইউরোকে একটি আধুনিক এবং অতিরিক্ত পেমেন্ট মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা প্রচলিত নগদ অর্থের পাশাপাশি ইউরোপের পেমেন্ট সার্বভৌমত্বকে আরও সুসংহত করবে। এই প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তুতিমূলক পর্যায়, যার মধ্যে প্রযুক্তিগত স্থাপত্য এবং নিয়মাবলী নির্ধারণ অন্তর্ভুক্ত ছিল, ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিল ডিজিটাল ইউরো নিয়ে তাদের আলোচনার অবস্থান অনুমোদন করে। এই পদক্ষেপটি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সাথে আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে, যাতে এই নতুন ডিজিটাল মুদ্রার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়।
ইসিবি-র এই উদ্যোগের পাশাপাশি ইউরোপে একটি বিকল্প বেসরকারি পেমেন্ট অবকাঠামোও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। ডয়েচে ব্যাংক (Deutsche Bank), বিএনপি পারিবাস (BNP Paribas) এবং আইএনজি (ING)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তৈরি 'Wero' সিস্টেমটি এখন ভিসা, মাস্টারকার্ড এবং পেপ্যাল (PayPal)-এর মতো বৈশ্বিক জায়ান্টদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা হলো, এই ধরনের স্থানীয় পেমেন্ট ব্যবস্থাগুলো ভবিষ্যতে ইউরোপের মোট লেনদেনের প্রায় ৯০% পর্যন্ত পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এর ফলে বিদেশি পেমেন্ট প্রোভাইডারদের ওপর ইউরোপের দীর্ঘদিনের নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
তবে আর্থিক ব্যবস্থার ওপর থেকে সরকারি নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় টমাস পিকেটি (Thomas Piketty) সহ ৭০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কাছে একটি খোলা চিঠি পাঠান। চিঠিতে তারা সতর্ক করে দেন যে, ডিজিটাল ইউরোর মতো কোনো শক্তিশালী সরকারি বা পাবলিক সমাধান না থাকলে ইউরোপের বাজার খুব সহজেই বেসরকারি স্টেবেলকয়েন এবং বিদেশি পেমেন্ট কোম্পানিগুলোর দখলে চলে যেতে পারে। এই অর্থনীতিবিদরা ডিজিটাল ইউরোকে একটি 'জনহিতকর পণ্য' বা পাবলিক গুড হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, এতে মৌলিক পরিষেবাগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকতে হবে এবং অফলাইনে ব্যবহারের সুবিধা থাকতে হবে, যাতে বাহ্যিক কোনো আর্থিক বা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া যায়।
ডিজিটাল ইউরোর নকশায় জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এই দাবিটি আবার ব্যাংকিং খাতের উদ্বেগের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আশঙ্কা করছে যে, ডিজিটাল ইউরো চালু হলে ব্যাংক থেকে আমানত বা ডিপোজিট অন্য দিকে সরে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান ব্যাংকিং অ্যাসোসিয়েশন ইসিবি-র এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল বলে সমালোচনা করেছে। তা সত্ত্বেও, ব্রাসেলস বর্তমানে আর্থিক স্বায়ত্তশাসনকে যে কৌশলগত গুরুত্ব দিচ্ছে, তা ডিজিটাল অর্থনীতিতে ইউরোপের টিকে থাকার লড়াইকেই তুলে ধরে। ইউরোপ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে যেখানে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজস্ব ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি করা অপরিহার্য। ২০২৭ সালে ডিজিটাল ইউরোর পরীক্ষামূলক পাইলট লঞ্চ এবং ২০২৯ সালে এর সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে ইউরোপ তার আর্থিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
16 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Luxemburger Wort
Perfil
The Paypers
BTCC
Global Issues
TradingView
Law&Trends
TodayOnChain
Crypto Economy
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
