গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির রোবট-কুকুর প্রদর্শনীর কেলেঙ্কারি: 'স্বদেশী' উদ্ভাবনের নামে বাণিজ্যিক পণ্যের ব্যবহার

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৬ সালের ১৬ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপম কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত 'ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬' (India AI Impact Summit 2026) একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণে বিতর্কের মুখে পড়ে। গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি (Galgotias University) তাদের 'সেন্টার অফ এক্সিলেন্স'-এর নিজস্ব উদ্ভাবন হিসেবে 'অরিয়ন' (Orion) নামক একটি চারপেয়ে রোবট প্রদর্শন করে। এই প্রদর্শনীটি মূলত প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ জাহির করার উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত অপমানে পর্যবসিত হয়।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এবং পর্যবেক্ষকরা দ্রুত শনাক্ত করেন যে, প্রদর্শিত ডিভাইসটি আসলে চীনের ইউনিট্রী রোবটিক্স (Unitree Robotics) দ্বারা নির্মিত একটি বাণিজ্যিক মডেল 'ইউনিট্রী গো২' (Unitree Go2)। এই ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে দেশীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাফল্য প্রদর্শনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক নেহা সিং রোবটটিকে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবন হিসেবে প্রচার করছেন, যা এমনকি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ডিডি নিউজ-এও (DD News) প্রচারিত হয়েছিল।

এই ঘটনার ফলে সৃষ্ট ব্যাপক জনরোষের মুখে সামিট কর্তৃপক্ষ গালগোটিয়াস বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের বরাদ্দকৃত স্টল খালি করার নির্দেশ দেয়। পরিস্থিতি এতটাই স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে যে, কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব (Ashwini Vaishnaw) তার অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে রোবটটির আগে শেয়ার করা ভিডিওটি মুছে ফেলেন। ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের (MeitY) সচিব এস. কৃষ্ণান এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, সরকার কোনোভাবেই এমন প্রদর্শনী বরদাস্ত করবে না যা প্রদর্শকদের প্রকৃত উদ্ভাবন নয় এবং এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্য ছড়ানো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং 'ইন্ডিয়া এআই' (India AI) মিশনের সিইও অভিষেক সিং সরাসরি অভিযোগ করেন যে, আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে রোবটটির উদ্ভাবক হিসেবে নিজেদের দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মূলত 'বিভ্রান্তি' ছড়িয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গালগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। তারা দাবি করে যে, তাদের একজন 'অল্প তথ্য জানা' প্রতিনিধি অতি উৎসাহী হয়ে এই ভুলটি করেছেন। তারা আরও স্পষ্ট করে যে, রোবটটি মূলত একটি শিক্ষা উপকরণ হিসেবে কেনা হয়েছিল এবং তারা এআই ইকোসিস্টেমে প্রায় ৩৫০ কোটি রুপি বিনিয়োগ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার নীতিন কুমার গৌর 'উদ্ভাবন করা' এবং 'উদ্ভাবনের ওপর কাজ করা'—এই দুই ধারণার মধ্যে পার্থক্য করার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন যে, তারা কেনা ডিভাইসের ওপর ভিত্তি করে একাডেমিক গবেষণা চালাচ্ছিলেন। তবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার) এর 'কমিউনিটি নোট' বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দাবিকে খণ্ডন করে দেয়। উল্লেখ্য যে, ইউনিট্রী গো২ মডেলটি ভারতে ২ থেকে ৩ লাখ রুপিতে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এবং এটি মূলত গবেষণা ও শিক্ষার জন্য একটি বহুমুখী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত।

এই কেলেঙ্কারিটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও নজর কেড়েছে এবং সামিটে ঘোষিত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে। বিরোধী দলীয় নেতারা এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো সামিটকে একটি 'অগোছালো পিআর স্টান্ট' হিসেবে সমালোচনা করেছেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য একটি প্রদর্শনী 'ফুটবল ড্রোন' নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে, যা সম্ভবত আরেকটি বাণিজ্যিক পণ্য ছিল। এই ঘটনাটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা প্রদর্শনের আকাঙ্ক্ষা এবং জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

4 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Kalki Online

  • Morning Brew

  • India TV News

  • The Online Citizen

  • Daily Pioneer

  • Business Research Insights

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।