২০২৬ সালের ৩রা জানুয়ারি, শনিবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনিজুয়েলায় এক বৃহৎ সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যার ফলস্বরূপ দেশটির নেতা নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করা হয় এবং বিমানযোগে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই অভিযানটি 'অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার'-এর অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছিল বলে জানা যায়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের এক নতুন মাত্রা যোগ করে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে মাদুরোর বিরুদ্ধে পূর্বে জারি করা মাদক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বৈধতা দেন, যেখানে তাকে কলম্বিয়ার গেরিলা গোষ্ঠী ফার্ক-এর সাথে কোকেন ও অস্ত্র পাচারের ষড়যন্ত্রের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।
এই উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মিশনে মার্কিন সেনাবাহিনীর এলিট ইউনিট ডেল্টা ফোর্সের (১ম স্পেশাল ফোর্সেস অপারেশনাল ডিটাচমেন্ট-ডেল্টা) সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এই ইউনিট অতীতে আবু বকর আল-বাগদাদি এবং সাদ্দাম হোসেনের মতো উচ্চ-মূল্যের লক্ষ্যবস্তু (HVT) আটক বা নির্মূলে ভূমিকা রেখেছে। অভিযানটি ভেনেজুয়েলার স্থানীয় সময় ভোর ২:০০ টা বা গ্রিনিচ সময় সকাল ৬:০০ টায় কারাকাসে একাধিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে শুরু হয়, যেখানে নিম্ন-উড়ন্ত বিমানও দেখা গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে নিশ্চিত করেন যে এই 'বিশাল আকারের অভিযান' সফল হয়েছে এবং মাদুরো ও ফ্লোরেসকে আটক করে দেশ থেকে বের করে আনা হয়েছে।
ভেনিজুয়েলার সরকার এই ঘটনাকে 'সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণ' এবং জাতিসংঘের সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ দম্পতির 'জীবন্ত প্রমাণ' দাবি করেন, কারণ কারাকাসের কাছে তাদের অবস্থান অজানা ছিল। এই অভিযানটি ১৯৮৯ সালে পানামার ম্যানুয়েল নরিনগার বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের সাথে তুলনীয়, যা মাদক পাচারের অভিযোগের ভিত্তিতেই সংঘটিত হয়েছিল। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি নিশ্চিত করেন যে মাদুরো এবং তার স্ত্রী নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্টে মাদক সন্ত্রাসবাদ এবং অন্যান্য অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন হবেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্রভাবে বিভক্ত। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই আটককে স্বাগত জানিয়ে 'স্বাধীনতার জয়' ঘোষণা করেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতিফলন। অন্যদিকে, প্রতিবেশী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই ঘটনাকে 'ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ' বলে অভিহিত করেন এবং মানবিক সংকটের আশঙ্কা প্রকাশ করেন। রাশিয়া এবং ইরান এই সামরিক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা করে এটিকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন এবং সশস্ত্র আগ্রাসন বলে আখ্যায়িত করে, যেখানে ইরান জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচ্চ প্রতিনিধি কায়া কালাস আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানান।
এই সামরিক পদক্ষেপটি আগস্টে শুরু হওয়া 'অপারেশন সাউদার্ন স্পিয়ার'-এর চূড়ান্ত পরিণতি, যা মাদক পাচার দমনের নামে ক্যারিবিয়ান সাগরে নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শন এবং ভেনিজুয়েলার তেল ট্যাঙ্কার জব্দ করার মাধ্যমে ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল। ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযানের ঘোষণা দেন, যা মাদক কার্টেল নির্মূলের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরি মাচাদো এই পদক্ষেপকে স্বাধীনতার আগমনী বার্তা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। এই ঘটনাটি লাতিন আমেরিকায় শীতল যুদ্ধের পরবর্তী সবচেয়ে সরাসরি এবং নাটকীয় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।



