Board of Peace - দাভোসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগ
বোর্ড অফ পিস: দাভোসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগ ও এর মূল বৈশিষ্ট্য
লেখক: gaya ❤️ one
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) বার্ষিক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প 'বোর্ড অফ পিস' (Board of Peace) নামক একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এই সংস্থাটির প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখা। মূলত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে গাজা উপত্যকার সংকট নিরসনে ট্রাম্প যে ২০-দফা পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতায় এই পরিষদের জন্ম। উল্লেখ্য যে, ট্রাম্পের সেই পরিকল্পনাটি ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর রেজোলিউশনের মাধ্যমে স্বীকৃতি লাভ করেছিল। এই পরিকল্পনার আওতায় গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, হামাসকে বিলুপ্ত করা এবং জিম্মিদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ট্রাম্পের লক্ষ্য হলো গাজাকে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা, যা দুবাই বা আবুধাবির মতো সমৃদ্ধ হবে। ট্রাম্প এই পরিষদকে জাতিসংঘের একটি বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, কারণ তার মতে জাতিসংঘ তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে।
২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি এই পরিষদের সনদ স্বাক্ষরের আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এই সনদে প্রথম স্বাক্ষর করেন এবং তার সাথে বিশ্বের ২০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা এই নতুন সংস্থায় যোগ দেন। স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, জর্ডান, কাজাখস্তান, কাতার, কসোভো, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, মঙ্গোলিয়া, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, সৌদি আরব, তুরস্ক, উজবেকিস্তান, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঐতিহ্যবাহী মিত্র যেমন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, নরওয়ে এবং সুইডেন এই উদ্যোগ থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার এই পরিষদের অস্পষ্ট ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অন্যদিকে, ফ্রান্স এই সংস্থাকে জাতিসংঘের সমান্তরাল একটি ব্যবস্থা হিসেবে মনে করায় ট্রাম্প ফরাসি ওয়াইনের ওপর ২০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন, যদিও তা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। কানাডা এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও স্থায়ী সদস্যপদের জন্য নির্ধারিত ১ বিলিয়ন ডলারের ফি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রায় ৬০টি দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার মধ্যে রাশিয়াও ছিল, যা পশ্চিমা নেতাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
বোর্ড অফ পিস-এর সনদটি ১৩টি অধ্যায় এবং একটি প্রস্তাবনার সমন্বয়ে গঠিত, যা 'দ্য টাইমস অফ ইসরায়েল'-এ বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এই সনদে সংস্থাকে একটি 'নমনীয় এবং কার্যকর' শান্তি বিনির্মাণ কাঠামো হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এটি মূলত সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। সনদের প্রধান দিকগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
- মিশন ও লক্ষ্য (অধ্যায় ১): এই পরিষদের মূল উদ্দেশ্য হলো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং শাসন ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা। এটি প্রচলিত ব্যর্থ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর না করে বাস্তবসম্মত সমাধানের ওপর জোর দেয়। এই সনদ আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলে এবং বিশ্বজুড়ে প্রয়োগের জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতিগুলো তৈরি করার সুযোগ দেয়।
- সদস্যপদ (অধ্যায় ২): এই পরিষদে যোগদানের জন্য কেবল চেয়ারম্যানের আমন্ত্রণ প্রয়োজন। সাধারণ সদস্যদের মেয়াদ ৩ বছর হলেও চেয়ারম্যান তা বৃদ্ধি করতে পারেন। তবে প্রথম বছরে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অনুদান প্রদানকারী দেশগুলো স্থায়ী সদস্যপদ লাভ করবে। সদস্যরা তাদের জাতীয় আইনের সীমার মধ্যে থেকে পরিষদের কার্যক্রমকে সমর্থন করবেন এবং নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সদস্যপদ ত্যাগ করতে পারবেন।
- শাসন ব্যবস্থা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ (অধ্যায় ৩-৪): ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিষদের আজীবন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং তার উত্তরসূরি মনোনীত করার ক্ষমতাও তার থাকবে। চেয়ারম্যানের হাতে এককভাবে রেজোলিউশন গ্রহণ (ধারা ৯) এবং নির্বাহী পরিষদের যেকোনো সিদ্ধান্তে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে। বোর্ড অফ পিস বাজেট এবং নীতিমালার ওপর ভোট দিলেও সকল সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যানের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। নির্বাহী পরিষদে মার্কো রুবিও, জ্যারেড কুশনার এবং টনি ব্লেয়ারের মতো ৭ জন প্রভাবশালী সদস্য রয়েছেন যারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তবে তা চেয়ারম্যানের ভেটো ক্ষমতার অধীন।
- অর্থায়ন, আইনি মর্যাদা ও বিলুপ্তি (অধ্যায় ৫-১০): এই পরিষদের কার্যক্রম মূলত স্বেচ্ছামূলক অনুদানের মাধ্যমে পরিচালিত হবে এবং এটি চুক্তি সম্পাদনের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইনি সত্তা হিসেবে কাজ করবে। সনদের দশম অধ্যায় অনুযায়ী, চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অথবা প্রতি বিজোড় বছরগুলোর শেষে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হতে পারে যদি এর কার্যক্রমের মেয়াদ বাড়ানো না হয়।
সমালোচকরা এই নতুন সংস্থাকে ট্রাম্পের একটি 'পেইড ক্লাব' বা অর্থের বিনিময়ে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ এখানে ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ এবং বিশাল আর্থিক শর্তাবলী রয়েছে। যদিও জাতিসংঘ ২০২৭ সাল পর্যন্ত গাজায় এই পরিষদের কার্যক্রমকে অনুমোদন দিয়েছে, তবে তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে এটি জাতিসংঘের কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গ নয়। বোর্ড অফ পিস-এর সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে এর তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা এবং গাজার বাইরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংকটে এর কার্যকারিতা প্রমাণের ওপর। তবে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে বিদ্যমান সংশয় এবং অনীহা এই সংস্থার বৈশ্বিক প্রভাবকে সীমিত করতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
উৎসসমূহ
nbcnews
Reuters
