আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গাম্বিয়া কর্তৃক মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি গণহত্যার অভিযোগের মূল বিষয়বস্তু পরীক্ষা করার জন্য বহুল প্রতীক্ষিত গণশুনানি শুরু হয়েছে। এই শুনানিটি ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি নেদারল্যান্ডসের হেগে শুরু হয়েছে এবং এটি ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত তিন সপ্তাহ ধরে চলবে। এই প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ, কারণ এটি এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে গণহত্যার অভিযোগে আইসিজে-এর প্রথম পূর্ণাঙ্গ মূল শুনানি।
এই শুনানির কেন্দ্রবিন্দু হলো মিয়ানমার ২০১৭ সালের রাখাইন রাজ্যে পরিচালিত সামরিক 'পরিষ্কার অভিযান'-এর কারণে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে কিনা, তা নির্ধারণ করা। গাম্বিয়া কর্তৃক মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে, যা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা দায়েরের সুযোগ করে দিয়েছে। এই সামরিক অভিযান চলাকালীন সময়ে গণহত্যামূলক হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক ধর্ষণ এবং অগ্নিসংযোগের অভিযোগ ওঠে, যার ফলে সাত লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
মিয়ানমার, যা বর্তমানে সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তারা ধারাবাহিকভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, যেখানে আং সান সু চি ২০১৯ সালে যুক্তি দিয়েছিলেন যে এটি বিদ্রোহীদের সাথে লড়াইয়ের ফলস্বরূপ অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের ঘটনা। তবে, আইসিজে ২০২২ সালের জুলাই মাসে মিয়ানমারের এখতিয়ার সংক্রান্ত প্রাথমিক আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে, যার ফলে মামলাটি এই মূল্যায়নের পর্যায়ে অগ্রসর হতে পারে।
এই শুনানির বিশেষত্ব হলো, এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মিয়ানমারে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের উপর গুরুতর নির্যাতন অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালতের নির্দেশিত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা লঙ্ঘনের শামিল। গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দিয়েছেন যে আইসিজে না থাকলে সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের উপর তাদের নিপীড়ন অব্যাহত রাখতে কোনো বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারত। রিফিউজি উইমেন ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের লাকি করিম এই আইসিজে মামলাটিকে ন্যায়বিচারের জন্য 'আশার আলো' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
শুনানির সময়সূচি অনুসারে, প্রথম সপ্তাহে গাম্বিয়া এবং মিয়ানমার উভয় পক্ষই সামরিক বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতার প্রমাণ সংক্রান্ত মৌখিক যুক্তি উপস্থাপন করবে। দ্বিতীয় সপ্তাহে অত্যন্ত বিরল সাক্ষী পরীক্ষার অধিবেশন (যা গোপন কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেখানে কক্সবাজার থেকে আসা রোহিঙ্গা পুরুষ, মহিলা এবং হিজড়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা সরাসরি আদালতে সাক্ষ্য দেবেন। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সরাসরি সাক্ষ্যদান একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা, যা এই মামলার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
এই মামলার বৃহত্তর তাৎপর্য রয়েছে, কারণ এর সিদ্ধান্ত রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও অন্যান্য চলমান গণহত্যার মামলা, যেমন দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে মিয়ানমারে প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে রাখাইন রাজ্যে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের উপর পদ্ধতিগত নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। কানাডা, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্র গাম্বিয়ার পক্ষে হস্তক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে, যা এই মামলার আন্তর্জাতিক সমর্থনকে প্রতিফলিত করে।




