ফিনল্যান্ডে ওনকালো প্রকল্পের শুভ উদ্বোধন: বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বর্জ্যের গভীর ভূগর্ভস্থ সমাধান
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ফিনল্যান্ড বর্তমানে ওনকালো নামক একটি ঐতিহাসিক প্রকল্পের উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্বের প্রথম ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির গভীর ভূতাত্ত্বিক নিষ্কাশন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ফিনল্যান্ডের ইউরাজোকি মিউনিসিপ্যালিটির ওলকিলুয়োটো দ্বীপে অবস্থিত এই প্রকল্পটি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বৈপ্লবিক বিশ্বজনীন সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পোসিভা (Posiva) নামক একটি প্রতিষ্ঠান এই প্রকল্পের পুরো তদারকি করছে, যা ১৯৯৫ সালে টেওলিসুডেন ভয়মা (৬০%) এবং ফোর্টাম (৪০%) এর যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের বর্তমান অগ্রগতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এখানে পারমাণবিক জ্বালানির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ওলকিলুয়োটো দ্বীপটিকে ২০০০ সালে এই প্রকল্পের জন্য নির্বাচন করা হয়েছিল, যা মূলত ফিনল্যান্ডের ১৯৯৪ সালের পারমাণবিক শক্তি আইনের একটি বাধ্যতামূলক প্রতিফলন। এই আইন অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত সকল তেজস্ক্রিয় বর্জ্য দেশেই নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ওনকালো, যার শাব্দিক অর্থ হলো 'ছোট গুহা', গ্রানাইট পাথরের ১.৯ বিলিয়ন বছরের পুরনো স্তরে ৪০০ মিটারেরও বেশি গভীরে খনন করা হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত তেজস্ক্রিয় রডগুলোকে একটি বিশেষ প্ল্যান্টে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে তামার কন্টেইনারে সিল করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোকে সুড়ঙ্গের ভেতর বেনটোনাইট কাদা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে।
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পের মোট বাজেট প্রায় ১ বিলিয়ন ইউরো এবং এটি ৬,৫০০ টন পর্যন্ত ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি ধারণ করতে সক্ষম। প্রকল্পটি অন্তত ২১২০ এর দশক পর্যন্ত এর কার্যক্রম চালিয়ে যাবে এবং এরপর এর সকল প্রবেশপথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। ২০২৪ সালের ৩০ আগস্ট থেকে সিস্টেমের চূড়ান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে যাতে সব যন্ত্রপাতির কারিগরি সক্ষমতা যাচাই করা যায়। পোসিভার প্রোডাকশন ডিরেক্টর কারি ওসারা জানিয়েছেন যে, ভূগর্ভস্থ এই স্থাপনার পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য বর্তমানে অ-তেজস্ক্রিয় সিমুলেটর ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কর্মীরা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছেন।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) ২০২০ সালে ফিনল্যান্ডের এই যুগান্তকারী অর্জনকে একটি "গেম চেঞ্জার" হিসেবে বর্ণনা করেছে। যদিও এই প্রকৌশলগত উৎকর্ষ নিয়ে কিছু বিতর্কও বিদ্যমান। যেমন, ইউনিয়ন অফ কনসার্নড সায়েন্টিস্টস-এর বিশেষজ্ঞ এডউইন লাইম্যান হাজার হাজার বছর ধরে তামার কন্টেইনারগুলোর স্থায়িত্ব এবং ক্ষয় হওয়ার গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও বিজ্ঞানীদের মতে ভূপৃষ্ঠে রাখার চেয়ে ভূতাত্ত্বিক স্তরে জমা রাখা অনেক বেশি নিরাপদ, তবুও সুইডেনে পরিচালিত গবেষণায় কপার ক্যাপসুলগুলোর আয়ুষ্কাল নিয়ে কিছু সংশয় দেখা দিয়েছে।
পারমাণবিক বর্জ্য সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে ফিনল্যান্ড ও সুইডেন বর্তমানে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্বের আসনে রয়েছে। সুইডেন ২০২৫ সালে ফোর্সমার্ক এলাকায় তাদের ভূগর্ভস্থ ভাণ্ডার নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে, যা ২০৩০-এর দশকের শেষের দিকে চালু হতে পারে। ওনকালো প্রকল্পটি অন্তত ২১২০-এর দশক পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে, যা পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বর্জ্যের বোঝা না চাপানোর ফিনিশ অঙ্গীকারের প্রতীক। সামগ্রিক এই স্থাপনাটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা অন্তত কয়েক লক্ষ বছর ধরে মানব বসতি এবং জীবমণ্ডল থেকে তেজস্ক্রিয়তাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ দূরত্বে রাখবে।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
New York Post
Bloomberg Business
Houston Chronicle
Posiva Oy
Wikipedia
Helsinki Times
American Nuclear Society
Reuters
Financial Post
POLITICO Pro
Clean Energy Wire
Pollar
এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



