২০২৬ সালের ১৯–২০ এপ্রিল ডাব্লুএইচও-ইউরোপ এবং ইউরোপীয় কমিশন 'Artificial intelligence is reshaping health systems: state of readiness across the European Union' শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবায় কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হচ্ছে এবং তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলো এই পরিবর্তনের জন্য কতটা প্রস্তুত, সে বিষয়ে প্রথম পদ্ধতিগত পর্যালোচনা। ২০২৪-২০২৫ সালে সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই গবেষণায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের অধিকাংশ সদস্য রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইইউ-এর ৭৪% দেশ ইতিমধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত রোগনির্ণয় পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এটি মূলত এমন সব সিস্টেমের কথা বলছে যা এক্স-রে, সিটি স্ক্যান এবং এমআরআই-এর মতো মেডিকেল ইমেজ বিশ্লেষণ করে এবং চিকিৎসকদের তথ্য ব্যাখ্যা ও ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। অনেক দেশে এই সরঞ্জামগুলো পরীক্ষামূলক বা আংশিকভাবে ব্যবহৃত হলেও ডায়াগনস্টিক ইউনিটগুলোর কার্যক্রমে এগুলো ইতিপূর্বেই যুক্ত করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ইইউ-এর ৬৩% দেশ রোগীদের সাথে যোগাযোগের জন্য চ্যাটবট ব্যবহার করছে। এই ব্যবস্থাগুলো প্রাথমিক প্রশ্নের উত্তর দিতে, রোগীদের সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাতে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট সহজ করতে এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চাপ কমাতে সাহায্য করে। তবে প্রতিবেদনটিতে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে চ্যাটবটগুলো সরাসরি চিকিৎসকদের বিকল্প নয়, বরং চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
একইসাথে অন্য একটি প্রবণতাও স্পষ্ট: ইইউ-এর মাত্র ৮% দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য বিশেষ জাতীয় এআই কৌশল রয়েছে। অধিকাংশ রাষ্ট্রই বর্তমানে ডিজিটালাইজেশন এবং এআই সংক্রান্ত সাধারণ জাতীয় বা আঞ্চলিক কৌশলের ওপর নির্ভর করছে, যেখানে চিকিৎসার জন্য আলাদা কোনো গভীর কর্মসূচি নেই। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এর ফলে সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
ডাব্লুএইচও-ইউরোপ এবং ইইউ মনে করে যে, স্বাস্থ্যসেবায় এআই ব্যবহারের এই বৃদ্ধি কোভিড-১৯ মহামারীর ফলস্বরূপ হয়েছে, যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং কাজের চাপকে ত্বরান্বিত করেছে। কর্মী সংকট এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর অতিরিক্ত চাপের মুখে এআই সরঞ্জামগুলোকে দ্রুত রোগনির্ণয়, চিকিৎসকদের কাজের চাপ কমানো এবং দূরবর্তী অঞ্চলে পরিষেবার প্রাপ্যতা বাড়ানোর একটি উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এআই-এর প্রয়োগ অবশ্যই অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্য সুরক্ষার সাথে সম্পর্কিত হতে হবে।
এই প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল রেগুলেটরি বা নিয়ন্ত্রক ক্ষেত্রের মূল্যায়ন। এতে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে, ২০২৪ সালে 'EU AI Act' প্রবর্তনের ফলে স্বাস্থ্যসেবার মতো উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোসহ ইইউ-তে এআই-এর জন্য একটি সাধারণ আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই আইনি কাঠামোটি নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সুযোগ করে দেয়। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো জানিয়েছে যে, আইনের এই শর্তগুলো বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত সম্পদ এবং সময়ের প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর সুবিধার তিনটি মূল ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটি হলো চিকিৎসার মান: ছবির দ্রুত বিশ্লেষণ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা এবং চিকিৎসার পদ্ধতির মানককরণ। দ্বিতীয়টি হলো প্রাপ্যতা ও সমতা: বিশেষ করে বিশেষজ্ঞের অভাব রয়েছে এমন প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো। তৃতীয়টি হলো সিস্টেমের কার্যকারিতা: রুটিন মাফিক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় করার মাধ্যমে কর্মীদের চাপ কমানো এবং লজিস্টিক ও নথিপত্রের কাজ সহজ করা।
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও এই প্রতিবেদনে গোপন করা হয়নি। ডাব্লুএইচও-ইউরোপের বিশেষজ্ঞরা অ্যালগরিদমের সম্ভাব্য ভুলকে অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, বিশেষ করে যখন মডেলগুলো সীমিত তথ্যের ওপর পরীক্ষা করা হয় বা অপ্রচলিত ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়। এটিও জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, স্বচ্ছতা এবং ব্যাখ্যার অভাব এখনো একটি সংকটপূর্ণ বিষয়: অনেক এআই সিস্টেম এখনো চিকিৎসক এবং রোগীদের কাছে বোঝার মতো সহজ নয়।
এছাড়া, নথিতে নীতিশাস্ত্র, গোপনীয়তা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, এআই-এর সহায়তায় নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত অবশ্যই বোধগম্য, নিয়ন্ত্রণযোগ্য এবং রোগীর অধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বেশ কয়েকটি দেশ ইতিমধ্যে এআই সিস্টেমের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করার জন্য প্রকল্প শুরু করেছে এবং পরীক্ষা ও সার্টিফিকেশনের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরদার করছে।
প্রতিবেদনের একটি নির্দিষ্ট অংশ আন্তর্জাতিক এবং আন্তঃক্ষেত্রীয় সহযোগিতার ওপর আলোকপাত করেছে। এতে বলা হয়েছে যে, ইউনিসেফ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক অংশীদাররা বেশ কিছু দেশে, বিশেষ করে সীমিত সম্পদের অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্যসেবায় এআই সমাধান প্রবর্তনের প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে। নথিতে গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে, দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা, তথ্য এবং মানের আদান-প্রদান নিরাপদ ও কার্যকর সমাধানের বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে পারে, তবে এর জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।
তবে মিডিয়ায় প্রকাশিত অনেক তথ্যের সাথে এই প্রতিবেদনের সরাসরি মিল নেই। উদাহরণস্বরূপ, ডাব্লুএইচও-ইউরোপ কোথাও ঢালাওভাবে 'এআই-এর ৯০%+ নির্ভুলতা' দাবি করেনি; নির্ভুলতার হার মূলত নির্দিষ্ট সিস্টেম, কাজ এবং গবেষণার ওপর নির্ভর করে। নথিতে এমন কোনো সরাসরি বক্তব্যও নেই যে এআই 'ভুল ৩০% কমিয়ে দেয়'; প্রতিবেদনে এমন কোনো সাধারণ সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি, যদিও নির্দিষ্ট কিছু পাইলট প্রকল্পে এমন প্রভাব দেখা যেতে পারে।
পরিশেষে, প্রতিবেদনটি এমন একটি নথি যা একইসাথে বর্তমান অগ্রগতি নথিভুক্ত করে এবং ঝুঁকি, সীমাবদ্ধতা ও পরবর্তী কাজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। এটি দেখায় যে ইইউ-এর বেশিরভাগ দেশে স্বাস্থ্যসেবার দৈনন্দিন কাজে এআই ইতিমধ্যে প্রবেশ করেছে, তবে পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় এবং পরিপক্ক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এখনো অনেকটা পথ চলা বাকি।




