২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মন্ত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে একটি যুগান্তকারী প্রবিধান অনুমোদন করেছেন, যা রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার প্রায় চার বছর পর এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হলো। এই আইনি পদক্ষেপটি মূলত ইউরোপের জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার একটি চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নতুন প্রবিধানের মূল শর্তাবলি অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারির মধ্যে রাশিয়া থেকে সমস্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে, পাইপলাইনের মাধ্যমে আসা গ্যাসের সরবরাহ ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বন্ধ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে যেসব সদস্য রাষ্ট্র তাদের গ্যাস মজুদাগার বা স্টোরেজ পূর্ণ করতে বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হবে, তাদের জন্য ২০২৭ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত একটি সংক্ষিপ্ত ছাড়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এই আইন অমান্য করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিদের জন্য কমপক্ষে ২.৫ মিলিয়ন ইউরো এবং কোম্পানিগুলোর জন্য কমপক্ষে ৪০ মিলিয়ন ইউরো বা তাদের বার্ষিক মোট আয়ের ৩.৫% জরিমানা ধার্য করা হতে পারে।
আইনটি পাসের সমসাময়িক সময়ে, গ্রিনপিস বেলজিয়ামের পরিবেশবাদীরা ইইউ কাউন্সিলের সদর দপ্তরের সামনে একটি প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। সেখানে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্লাদিমির পুতিনের বিশাল আকৃতির ইনফ্ল্যাটেবল পুতুল ব্যবহার করে বিশ্বনেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। গ্রিনপিস জার্মানির জীবাশ্ম জ্বালানি বিশেষজ্ঞ লিসা গোল্ডনার সতর্ক করে বলেছেন যে, রুশ গ্যাস বর্জন করা একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও ইউরোপকে সতর্ক থাকতে হবে যাতে তারা মার্কিন জীবাশ্ম গ্যাসের ওপর নতুন করে নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এই ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানগুলো ইউরোপের জ্বালানি আমদানিতে একটি আমূল পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরছে। যুদ্ধের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট গ্যাস চাহিদার ৪০%-এর বেশি রাশিয়া সরবরাহ করত, যা ২০২৫ সাল নাগাদ নাটকীয়ভাবে কমে প্রায় ১৩%-এ নেমে এসেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ইইউ-তে রুশ এলএনজি সরবরাহ (১৯.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার) তাদের পাইপলাইন সরবরাহকে (১৮.১ বিলিয়ন ঘনমিটার) ছাড়িয়ে গেছে। তবে একই সময়ে ইউরোপীয় কমিশন লক্ষ্য করেছে যে, ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি প্রায় ২৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্যটি পরিবেশবাদী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে যে, ইউরোপ হয়তো একটি ভূ-রাজনৈতিক নির্ভরতা কাটিয়ে অন্য একটির জালে জড়িয়ে পড়ছে।
এই প্রবিধান বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ২০২৬ সালের ১ মার্চের মধ্যে তাদের নিজস্ব জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ পরিকল্পনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির প্রতিবেদন ইউরোপীয় কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। তবে এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইইউ-র ভেতরে সব দেশ একমত হতে পারেনি; স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে। স্লোভাকিয়া ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে তারা এই প্রবিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আদালতে মামলা দায়ের করবে। যদিও এই সিদ্ধান্তটি রুশ জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে, তবুও এটি দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অন্যান্য দেশের জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকি নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে।
পরিশেষে, ২০২৭ সালের এই লক্ষ্যমাত্রা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হিসেবে কাজ করবে। এই রূপান্তর কেবল পরিবেশগত কারণে নয়, বরং মহাদেশটির রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। সদস্য দেশগুলো এখন তাদের অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে বাধ্য হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপকে একটি টেকসই জ্বালানি কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে পারে।




