সৌরশক্তি কীভাবে ভ্যান গগের ‘স্টারি নাইট’-কে জীবন্ত করে তুলেছে
লেখক: Nataly Lemon
নেদারল্যান্ডসে একটি অসাধারণ ধারণা বাস্তবে রূপ পেয়েছে—বিখ্যাত পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পীর শিল্পকর্মের সাথে আধুনিক পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির মেলবন্ধন। উত্তর ব্রাবান্ট প্রদেশের নুয়েনেন শহরের কাছে, যেখানে ভিনসেন্ট ভ্যান গগ তার প্রাথমিক জীবনের অনেক কাজ তৈরি করেছিলেন, সেখানে ‘ভ্যান গগ-রোজগার্ড সাইকেল পাথ’ (Van Gogh–Roosegaarde Cycle Path) তৈরি করা হয়েছে। এই পথটি মূলত শিল্পীর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য স্টারি নাইট’-এর মোটিফগুলোকে জীবন্ত করে তোলে, আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় সৌরশক্তির মাধ্যমে।
এই ৬০০ মিটার দীর্ঘ পথটি দিনের বেলা সাধারণ সাইকেল চলাচলের রাস্তার মতোই মনে হয়। কিন্তু অন্ধকার নামার সাথে সাথেই এক জাদুকরী পরিবেশের সৃষ্টি হয়: অ্যাসফল্টের রাস্তাটি নিয়ন-নীল এবং সবুজ রঙের ঘূর্ণায়মান আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, যা ভ্যান গগের ছবির সেই গতিশীল ঘূর্ণিগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
এই উজ্জ্বলতার রহস্য লুকিয়ে আছে রাস্তার উপরিভাগে বসানো হাজার হাজার ফটো-লুমিনেসেন্ট পাথরের মধ্যে। এই প্রযুক্তিটি যেভাবে কাজ করে তা হলো:
- দিনের বেলা এই পাথরগুলো সূর্যের আলো শোষণ করে শক্তি সঞ্চয় করে;
- রাতে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ বা বাল্ব ছাড়াই সেই শক্তি ব্যবহার করে উজ্জ্বল সর্পিল আভা তৈরি করে;
- এটি সাইকেল চালকদের জন্য মৃদু আলো সরবরাহ করে এবং বাঁকগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এখানে কোনো তীব্র ফ্লাডলাইট নেই—শুধুমাত্র একটি স্নিগ্ধ আভা রয়েছে যা ব্রাবান্টের রাতের আকাশের সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এই প্রকল্পটি দেখায় যে কীভাবে উদ্ভাবন পরিবেশের ক্ষতি না করে কার্যকর হতে পারে। এর পরিবেশবান্ধব বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- ফটো-লুমিনেসেন্ট উপাদানগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সৌরশক্তির মাধ্যমে চার্জ হয়;
- অতিরিক্ত এলইডি আলোগুলোও সৌর প্যানেল থেকে শক্তি পায়;
- এটি শক্তির অপচয় এবং আলোক দূষণ কমিয়ে আনে;
- পুরো অবকাঠামোটি একই সাথে আবেগপূর্ণ এবং সাশ্রয়ী।
এটি কেবল একটি আলোকসজ্জা নয়, বরং প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করা একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা।
এই সাইকেল পথটি ৩৩০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ ‘ভ্যান গগ সাইকেল রুট’-এর একটি অংশ। এই বিশাল রুটটি ভ্যান গগের জীবন ও কর্মের সাথে জড়িত বিভিন্ন স্থানকে সংযুক্ত করেছে। এটি ওপওয়েটেনস (Opwettense) এবং কলস (Collse) নামক সেই সব বায়ুকলের পাশ দিয়ে গেছে, যা শিল্পী তার ‘দ্য পটেটো ইটারস’ তৈরির সময় এঁকেছিলেন। এই পথটি পর্যটকদের এমন সব গ্রামীণ দৃশ্য, গির্জার চূড়া এবং খালের প্রতিচ্ছবি দেখায় যা একসময় শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছিল। এভাবে পুরো রুটটি একটি উন্মুক্ত যাদুঘরে পরিণত হয়েছে।
এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনাকারী হলেন ডাচ ডিজাইনার দান রোজগার্ড (Daan Roosegaarde)। তার ‘স্মার্ট হাইওয়ে’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই পথটি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সৌরশক্তি চালিত ‘স্মার্ট রোড’ নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এর আগে তিনি মহাসড়কে উজ্জ্বল মার্কিং নিয়ে কাজ করেছিলেন যা প্রথাগত রাস্তার আলোর বিকল্প হিসেবে কাজ করে এবং সম্পদ সাশ্রয় করে। রোজগার্ড এখানে শিল্পের মূল চেতনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
ভ্যান গগের মৃত্যুর ১২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৪ সালে এই সাইকেল পথটি উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে এটি ব্রাবান্টের একটি প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এবং ‘ভ্যান গগ ২০১৫’ কর্মসূচির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই পথের ছবিগুলো লক্ষ লক্ষ বার দেখা হয়েছে এবং এটি এই অঞ্চলের সাইকেল সংস্কৃতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই প্রকল্পটি প্রমাণ করেছে যে শিল্প কেবল দেখার বিষয় নয়, এটি কার্যকরী এবং পরিবেশবান্ধব সমাধানের অংশও হতে পারে।
ভ্যান গগ-রোজগার্ড সাইকেল পথের সাফল্য বিশ্বজুড়ে একই ধরণের প্রকল্প গ্রহণে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সৌরশক্তি চালিত ‘স্মার্ট রোড’-এর ধারণা এখন বিভিন্ন দেশের পার্কের পথ এবং শহরের গলিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে। ব্রাবান্টে সৌরশক্তির এই জাদু ইতিহাসের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ভ্যান গগ একসময় ক্যানভাসে আলো ধরে রাখার চেষ্টা করতেন, আর এখন সেই আলো সাইকেল চালকদের চাকার নিচে প্রবাহিত হয়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শিল্প কেবল অতীত নয়, বরং ভবিষ্যতেরও পথপ্রদর্শক।
10 দৃশ্য
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



