২০২৬ সালের ১২ মার্চ চীনের ১৪তম ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) চতুর্থ অধিবেশনের সমাপনী বৈঠকে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদিন দেশটির আইনপ্রণেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পরিবেশ ও পরিবেশ সুরক্ষা কোড’ অনুমোদন করেছেন। এই নতুন আইনটি ২০২৬ সালের ১৫ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এই কোডটি মূলত কঠোর আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা এবং টেকসই ‘সবুজ’ উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
১,২৪২টি অনুচ্ছেদ বা আর্টিকেল নিয়ে গঠিত এই বিশাল কোডটি ৩০টিরও বেশি পৃথক আইন এবং ১০০টিরও বেশি প্রশাসনিক বিধিমালাকে একত্রিত করেছে। এর ফলে আগেকার পরিবেশ আইনে বিদ্যমান অসংগতি ও বিচ্ছিন্নতা দূর হবে। ২০২০ সালের সিভিল কোডের পর এটি আধুনিক চীনের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো বড় কোড। এর মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি রাজনৈতিক নীতি থেকে একটি বাধ্যতামূলক আইনি প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হলো।
এই কোডটির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি আধুনিক পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করে। এতে দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন দূষণ যেমন—রান্নাঘরের ধোঁয়া, শব্দ দূষণ এবং নতুন যুক্ত হওয়া ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ও আলোক দূষণের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। চায়না ইউনিভার্সিটি অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ল-এর অধ্যাপক ওয়াং কানফা (Wang Canfa) উল্লেখ করেছেন যে, এই কোডটি বিশ্বজুড়ে একটি নজির স্থাপন করেছে। কারণ এতে ‘সবুজ ও স্বল্প-কার্বন উন্নয়ন’ নিয়ে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে, যা বিশ্বের বিদ্যমান প্রায় ২০টি পরিবেশগত কোডের কোনোটিতেই নেই। এছাড়া গ্রামীণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং রেস্তোরাঁর রান্নাঘরের দূষণ রোধে এতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- এই আইনি দলিলটি চীনের দীর্ঘমেয়াদী সবুজ রূপান্তর এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়া এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের জাতীয় লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। চীনের স্টেট কাউন্সিলের তথ্য অফিস জানিয়েছে যে, কোডটির প্রথম অনুচ্ছেদেই পরিবেশ সুরক্ষাকে টেকসই উন্নয়নের গ্যারান্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ‘মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সুরেলা সহাবস্থান’ নিশ্চিত করা। একইসাথে, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারের চেয়ে বাস্তুসংস্থান পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
- আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও সম্প্রদায় এই পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। রাশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অফ চায়না অ্যান্ড কনটেম্পরারি এশিয়ার রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান পাভেল ট্রশিনস্কি (Pavel Troshchinsky) মনে করেন, এই কোডটি বিশ্ববাসীর কাছে চীনের পরিবেশ রক্ষার দৃঢ় সংকল্পের একটি বার্তা। তিনি আরও বলেন, বিচ্ছিন্ন আইনগুলোকে একীভূত করার ফলে পরিবেশগত নিয়মগুলো এখন পুরো সমাজের জন্য সাধারণ নিয়মে পরিণত হবে। চীন ইতিমধ্যে বনজ সম্পদ বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে, যা এই কোডের কার্যকারিতাকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
পাঁচটি অংশ এবং ১২০০-এর বেশি অনুচ্ছেদ সম্বলিত এই কোডটি বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে পরিবেশগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় পদক্ষেপ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক ব্যবস্থায় পরিবেশ সুরক্ষাকে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উজবেকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক শারোফিদ্দিন তুলাগানভ (Sharofiddin Tulaganov) বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার এক গুণগত পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেছেন।



