ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA) এবং NASA-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত সোলার অ্যান্ড হেলিওস্ফেরিক অবজারভেটরি (SOHO) মিশনটি ২৫শে ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে উৎক্ষেপণের ত্রিশ বছর পূর্ণ করেছে। ১৯৯৫ সালে মহাকাশে পাঠানো এই মহাকাশযানটির প্রাথমিক কার্যকাল মাত্র দুই বছরের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবুও, এটি সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী ল্যাগ্রেঞ্জ পয়েন্ট L1-এ অবস্থান করে আমাদের নক্ষত্রকে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এর প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে পনেরো গুণ বেশি সময় ধরে কাজ করার এই দীর্ঘায়ু আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রকৌশল দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা ESA-এর বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক প্রফেসর ক্যারল ম্যান্ডেল বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।
SOHO-এর কার্যকাল জুড়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে, যা মিশনের অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা প্রমাণ করে। উৎক্ষেপণের আড়াই বছর পর, ১৯৯৮ সালের গ্রীষ্মে, মহাকাশযানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং তিন মাস ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে এটি ছিল অন্যতম কঠিন উদ্ধার অভিযান। এর পরপরই, ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে, স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য তিনটি জাইরোস্কোপই অকেজো হয়ে পড়ে। NASA এবং ESA-এর প্রকৌশলীরা দ্রুততার সঙ্গে এক যুগান্তকারী সফটওয়্যার তৈরি করেন, যা এই যন্ত্রাংশগুলি ছাড়াই SOHO-কে পরিচালনা করতে সক্ষম করে। এই নতুন ব্যবস্থা সফলভাবে ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মহাকাশযানের অনবোর্ড কম্পিউটারে আপলোড করা হয়, যার ফলে এটি জাইরোস্কোপ ছাড়াই তিন অক্ষীয় স্থিতিশীলতা অর্জনকারী প্রথম মহাকাশযান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
SOHO হেলিয়োসিজমোলজি বা সৌরকম্পনবিদ্যার ক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছে। এই পদ্ধতি সূর্যের অভ্যন্তরীণ কাঠামো অধ্যয়নের সুযোগ করে দেয়, যা তার পৃষ্ঠের কম্পন বিশ্লেষণ করে করা হয়। এই মিশনের তথ্য থেকে জানা যায় যে সূর্যের প্রতিটি গোলার্ধের অভ্যন্তরে প্লাজমা একটি একক বৈশ্বিক কনভেয়র বেল্টের মতো সঞ্চালিত হয়, যার একটি পূর্ণ আবর্তন সম্পন্ন করতে প্রায় ২২ বছর সময় লাগে, যা সৌরচুম্বকীয় চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষণায় আরও জানা গেছে যে মোট সৌর বিকিরণ (Total Solar Irradiance) চক্র চলাকালীন মাত্র ০.০৬% পরিবর্তিত হয়, যেখানে চরম অতিবেগুনী (EUV) বিকিরণ সর্বনিম্ন অবস্থা থেকে সর্বোচ্চ অবস্থায় দ্বিগুণ হয়।
মহাকাশ আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণে SOHO-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত এর LASCO করোণোগ্রাফ যন্ত্রটির মাধ্যমে। এই যন্ত্রটি করোোনাল মাস ইজেকশন (CME) শনাক্ত করে, যা পৃথিবীতে পৌঁছালে বিধ্বংসী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি করতে পারে। এই যন্ত্রটি তিন দিন পর্যন্ত আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২০ সালের অক্টোবরে PROSWIFT আইন প্রণীত হয়, যা মহাকাশ আবহাওয়ার পূর্বাভাসকে আইনি ভিত্তি প্রদান করে।
SOHO-এর একটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু উল্লেখযোগ্য অবদান হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধূমকেতু আবিষ্কারক যানে পরিণত করা। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত, এই মহাকাশযানটি মোট ৫০০০টি ধূমকেতু শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই NASA-অর্থায়িত Sungrazer প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিক বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন। এই বস্তুগুলিকে প্রায়শই 'সূর্য-চুম্বী' বলা হয়, কারণ তারা সূর্যের খুব কাছ দিয়ে অতিক্রম করে। করোণোগ্রাফের সাহায্যে উজ্জ্বল সূর্যকে আড়াল করার ক্ষমতার কারণেই এই ধূমকেতুগুলি দৃশ্যমান হয়।
প্রজন্মের পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে, SOHO তার উত্তরসূরিদের জন্য ভিত্তি স্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে NOAA-এর অপারেশনাল স্যাটেলাইট NOAA SWFO-L1, যা ২০২৫ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপিত হয়। L1 কক্ষপথে পৌঁছানোর পর SWFO-L1-এর নাম পরিবর্তন করে SOLAR-1 রাখা হবে। এটি NOAA-এর প্রথম স্যাটেলাইট যা সম্পূর্ণরূপে অপারেশনাল মহাকাশ আবহাওয়ার পর্যবেক্ষণের জন্য নিবেদিত, যা SOHO এবং DSCOVR-এর মতো পুরোনো যন্ত্রপাতির মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করবে। ESA এবং NASA-এর দলগুলি সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকার করেছে যে SOHO আধুনিক সৌর পদার্থবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর, যার দীর্ঘায়ু এবং বৈজ্ঞানিক ফলন প্রাথমিক দুই বছরের সময়সীমাকে বহুলাংশে ছাড়িয়ে গেছে। SOHO মিশনের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রফেসর ক্যারল ম্যান্ডেল এবং SOHO প্রকল্পের বিজ্ঞানী ড্যানিয়েল মুলার (যিনি ২০২৩ সাল থেকে সোলার অরবিটারের বিজ্ঞানী) সহ অন্যান্য সহকর্মীরা ২০২৫ সালের ২রা ডিসেম্বর নেচার অ্যাস্ট্রোনমি জার্নালে একটি পর্যালোচনা প্রকাশ করেছেন।
