রুডোজেম-ক্সানথি সীমান্ত পারাপার উন্মুক্ত: বুলগেরিয়া ও গ্রিসের ৩০ বছরের দীর্ঘ প্রকল্পের সফল সমাপ্তি
সম্পাদনা করেছেন: Irina Davgaleva
২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে রুডোজেম-ক্সানথি সীমান্ত পারাপারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে, যা স্থানীয়ভাবে 'এজিয়ান প্যাসেজ' বা এজিয়ান পথ নামে পরিচিত। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়েছে এবং বুলগেরিয়ার স্মোলিয়ান অঞ্চলের সাথে গ্রিসের ক্সানথি অঞ্চলের একটি সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেছে। এই প্রকল্পটি ট্রান্স-ইউরোপীয় ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্কের (TEN-T) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। দীর্ঘ ৩০ বছরের এই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে এক নতুন আশার আলো সঞ্চারিত হয়েছে। এই সংযোগটি কেবল দুটি ভৌগোলিক এলাকাকে যুক্ত করেনি, বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় যাতায়াত ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে।
Rudozem–Xanthi সীমান্ত ক্রসিংয়ের উদ্বোধন অনুষ্ঠান।
গ্রিসের দিকের রাস্তার শেষ অংশটির কাজ শেষ হতে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হওয়ায় এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন অনেক পিছিয়ে গিয়েছিল। অথচ বুলগেরিয়ার দিকের অবকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি কয়েক বছর আগেই সম্পন্ন হয়ে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত ছিল। রোডোপ পর্বতমালা থেকে এজিয়ান সাগরের উপকূল পর্যন্ত সংযোগকারী তিনটি প্রধান পথের মধ্যে এই করিডোরটি অন্যতম এবং এর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নতুন পথটি বুলগেরিয়ার বিখ্যাত স্কি রিসোর্ট পাম্পোরোভোর সাথে গ্রিসের কাভালা এবং ক্সানথির মনোরম উপকূলীয় অঞ্চলের সরাসরি যোগাযোগ নিশ্চিত করবে। এই ভৌগোলিক সংযোগটি পর্যটন শিল্পের বিকাশে এক অনন্য এবং সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশেষ করে শীতকালীন পাহাড়ি পর্যটন এবং গ্রীষ্মকালীন সমুদ্র সৈকতের পর্যটনের মধ্যে একটি চমৎকার সেতুবন্ধন তৈরি হবে।
রুডোজেমের মেয়র নেডকো কুলেভস্কি সহ স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যাপারে অত্যন্ত আশাবাদী। তাদের মতে, এই নতুন করিডোরটি খোলার ফলে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলে নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। যেহেতু বুলগেরিয়া ১ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শেনজেন এলাকার পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তাই এই পথটি মূলত শারীরিক যাতায়াত এবং যানবাহনের চলাচলকে সহজতর করবে। যদিও এখন আর নিয়মিত পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণের কড়াকড়ি থাকবে না, তবুও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী যেকোনো সময় বিশেষ তল্লাশি চালানোর অধিকার সংরক্ষণ করবে। এই নতুন প্রবেশদ্বারটি স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য গ্রিসের বাজারে প্রবেশের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এই এজিয়ান প্যাসেজটি কেবল ব্যক্তিগত যাত্রীবাহী গাড়ি এবং ৩.৫ টনের কম ওজনের হালকা বাণিজ্যিক যানবাহনের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ভারী পণ্যবাহী ট্রাক বা লরি চলাচলের জন্য আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে, কারণ ২০২৮ সালের আগে সেই সক্ষমতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তখন শেষ ১০ কিলোমিটার রাস্তার কাজ পুরোপুরি শেষ হবে এবং ভারী যানবাহনের ভার বহনের উপযোগী হবে। 'CrossBo2' নামক একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২২ মিলিয়ন ইউরো বাজেটে এই উন্নয়নমূলক কাজগুলো পরিচালিত হচ্ছে। এটি মূলত 'ক্সানথি-রুডোজেম-স্মোলিয়ান-প্লোভডিভ' অক্ষের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা ইউরোপীয় যাতায়াত ব্যবস্থার একটি প্রধান ধমনী হিসেবে কাজ করবে। এই অবকাঠামোগত উন্নয়নটি সম্পূর্ণ হলে দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের পণ্য পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থায় এক বিশাল পরিবর্তন আসবে।
এই প্রকল্পের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং জটিল; এর প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। গ্রিসের অংশে ঠিকাদারদের গাফিলতি, আইনি জটিলতা এবং বিভিন্ন অভিযোগের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ বন্ধ ছিল। তবে বুলগেরিয়া ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে তাদের অংশে পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করে এবং দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যায়। বুলগেরীয় অংশে প্রায় ১৭ মিলিয়ন লেভ (যা প্রায় ৮.৭ মিলিয়ন ইউরোর সমান) বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং ২০২৩ সালের মধ্যেই বর্ডার চেকপয়েন্টের কাজ শেষ করা হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে ডিমারিও থেকে বুলগেরীয় সীমান্ত পর্যন্ত রাস্তার অংশটি সম্পন্ন হওয়ার পর উদ্বোধনের পথ প্রশস্ত হয়। এই দীর্ঘ তিন দশকের যাত্রায় অনেক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাধা পেরিয়ে অবশেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে।
২০ জানুয়ারি ২০২৬-এর সেই জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই দেশের উচ্চপদস্থ সরকারি প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বুলগেরিয়ার পক্ষ থেকে পরিবহন মন্ত্রী গ্রোজদান কারাদজভ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী গেয়র্গি গেয়র্গিয়েভ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। গ্রিসের প্রতিনিধিত্ব করেন পরিবহন মন্ত্রী ক্রিস্টোস দিমাস এবং পূর্ব মেসিডোনিয়া ও থ্রেস অঞ্চলের গভর্নর ক্রিস্টোডুলোস টপসিডিস। এই পদক্ষেপটিকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং নিবিড় জনযোগাযোগ বৃদ্ধির একটি চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি বুলগেরিয়া এবং গ্রিসের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল। ভবিষ্যতে এই করিডোরটি সমগ্র বলকান অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং যৌথ উন্নয়নের এক শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে কাজ করবে বলে সকলে বিশ্বাস করেন।
30 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Trip.dir.bg
Новини СЕГА
Economic.bg
Клуб 'Z'
Actualno.com
News.bg
БНТ Новини
BTA
European Commission
Wikipedia
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
