ইতালির সার্ডিনিয়া এবং জাপানের ওকিনাওয়ার মতো বিশ্বজুড়ে চিহ্নিত 'ব্লু জোন' অঞ্চলগুলিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শতবর্ষী মানুষের উপস্থিতি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা তাদের দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনধারণের রহস্যের ওপর আলোকপাত করছে। এই সম্প্রদায়গুলির জীবনযাত্রার পদ্ধতি আধুনিক সমাজের থেকে বহুলাংশে ভিন্ন, যা দীর্ঘায়ুর কারণ অনুসন্ধানে গবেষকদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। ২০০৪ সালে জিয়ান্নি পেস এবং মিশেল পউলেইনের জনসংখ্যা সংক্রান্ত গবেষণার মাধ্যমে সার্ডিনিয়ার নুরো প্রদেশকে প্রথম 'ব্লু জোন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যেখানে পুরুষদের মধ্যে শতবর্ষী হওয়ার হার যুক্তরাষ্ট্রে দশগুণ বেশি ছিল। পরবর্তীকালে আমেরিকান লেখক ড্যান বুয়েটনার কোস্টা রিকার নিকোয়া উপদ্বীপ, গ্রিসের ইকারিয়া এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা সহ আরও চারটি অঞ্চলকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
এই দীর্ঘজীবী সম্প্রদায়গুলির একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক কার্যকলাপের স্বাভাবিক অন্তর্ভুক্তি। তারা ব্যায়ামের জন্য জিমে যাওয়ার পরিবর্তে বাগান করা বা ঘরোয়া কাজকর্মে নিজেদের নিয়োজিত রাখে, যা দেখায় যে জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত মাঝারি মাত্রার কায়িক পরিশ্রম স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। ওকিনাওয়ার প্রবীণদের রুটিনে সকাল হতেই বাগান করার মতো কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। পুষ্টির ক্ষেত্রে, ওকিনাওয়ানদের মধ্যে প্রচলিত 'হারা হাচি বু' নীতিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যার অর্থ হলো আহারের সময় পেট ৮০ শতাংশ পূর্ণ হলেই খাদ্য গ্রহণ বন্ধ করা। এই পরিমিত খাদ্যাভ্যাস প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও চিনির পরিমাণ কমিয়ে মুটিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করে, যা বার্ধক্যজনিত অনেক সমস্যার সূচনা করতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, জীবনের উদ্দেশ্য এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা হ্রাস করা দীর্ঘায়ুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে সকল ব্যক্তি সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে, তারা উদ্দেশ্যহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলি হ্রাস করতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে প্রত্যাশিত আয়ু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিতে পারে। মানসিক চাপ উদ্বেগ, হতাশা এবং ধূমপান বা মদ্যপানের মতো অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার অভ্যাসের দিকে চালিত করতে পারে, যা আয়ু হ্রাসের অন্যতম কারণ।
ব্লু জোনগুলির জীবনযাত্রার ধরন মূলত জীবনধারা-ভিত্তিক এবং পরিবর্তনশীল হওয়ায় আধুনিকায়নের প্রভাবে ইতিমধ্যেই কিছু অঞ্চলে এই দীর্ঘায়ুর প্রবণতা দুর্বল হতে শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, গবেষকরা এখন নীতি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন, যেমনটি ড্যান বুয়েটনারের ব্লু জোনস প্রজেক্ট কমিউনিটিজ-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে করা হচ্ছে। এই সমন্বিত জীবনযাত্রার শিক্ষাগুলি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে বসবাসকারী মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং জীবনকাল বাড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে।




