গরু Veronika
গরু ভেরোনিকার বহুমুখী সরঞ্জামের ব্যবহার: গবাদি পশুর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Elena HealthEnergy
অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা গবাদি পশুর বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে 'কারেন্ট বায়োলজি' (Current Biology) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে যে, গরু কেবল একটি সাধারণ প্রাণী নয়, বরং তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করে জটিল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম। ভেরোনিকা নামের একটি সুইস জাতের গরুর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত এই গবেষণাটি প্রমাণ করে যে, এতদিন আমরা গরুর বুদ্ধিমত্তাকে কতটা অবমূল্যায়ন করেছি। সরঞ্জাম ব্যবহারের এই দক্ষতা সাধারণত প্রাইমেট, কাকজাতীয় পাখি বা কিছু উন্নত পতঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে মনে করা হতো।
ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি অফ ভেটেরিনারি মেডিসিনের কগনিটিভ বায়োলজিস্ট অ্যালিস আউয়ারস্পার্গ এবং তার সহকর্মী আন্তোনিও ওসুনা-মাসকারো এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন। তাদের গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল ১৩ বছর বয়সী 'ব্রাউন সুইস' (Bos taurus) জাতের গরু ভেরোনিকা। অস্ট্রিয়ার নোটশ-ইম-গাইল্টাল (Nötsch im Gailtal) নামক স্থানে কৃষক উইটগার উইগেলসের তত্ত্বাবধানে এই গরুটি কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং একটি পোষা প্রাণী হিসেবে বেড়ে উঠেছে। উইগেলস জানান যে, ভেরোনিকা চার বছর বয়স থেকেই তার শরীরের দুর্গম স্থানে চুলকানোর জন্য লাঠি ব্যবহার করে আসছে, যা প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি আচরণ।
গত গ্রীষ্মে পরিচালিত এই পরীক্ষায় ভেরোনিকাকে একটি লম্বা হাতলযুক্ত শক্ত ব্রাশ দেওয়া হয়েছিল। সাতটি সেশনে মোট ৭০টি ট্রায়ালের মাধ্যমে দেখা গেছে যে, গরুটি বিভিন্ন অবস্থানে রাখা ব্রাশটি ব্যবহার করে অন্তত ৭৬ বার তার শরীরের চুলকানি দূর করেছে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, ভেরোনিকা একই সরঞ্জামের বিভিন্ন অংশ ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় 'মাল্টি-ফাংশনাল টুল ইউজ' বলা হয়। মানুষের বাইরে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে এই ধরনের বহুমুখী ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলেও বন্যপ্রাণীদের মধ্যে এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।
ভেরোনিকা তার শরীরের বিভিন্ন অংশের সংবেদনশীলতা অনুযায়ী ব্রাশ ব্যবহারের কৌশল পরিবর্তন করত। পিঠ বা পাশের চামড়া যেখানে তুলনামূলকভাবে শক্ত, সেখানে সে ব্রাশের শক্ত অংশ দিয়ে জোরে চুলকাত। অন্যদিকে, পেট বা উরুর মতো সংবেদনশীল জায়গায় সে ব্রাশের কাঠের হাতল ব্যবহার করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে চুলকানি দূর করত। গবেষকরা এই আচরণকে 'ইগোসেন্ট্রিক টুল ইউজ' হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও এটি সরঞ্জাম ব্যবহারের একটি প্রাথমিক স্তর হিসেবে বিবেচিত, তবুও এটি শিম্পাঞ্জিদের সমপর্যায়ের উন্নত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়। মুখ দিয়ে সরঞ্জাম পরিচালনা করার শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভেরোনিকা তার কাজের ফলাফল আগে থেকেই অনুমান করতে সক্ষম ছিল।
ভিয়েনার ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান-অ্যানিমেল রিলেশনশিপ রিসার্চের বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত এই গবেষণায় সুইজারল্যান্ডের মেসারলি ফাউন্ডেশন আংশিক অর্থায়ন করেছে। ডক্টর আউয়ারস্পার্গ উল্লেখ করেন যে, গরুর প্রতি আমাদের যে 'নির্বোধ' হওয়ার ধারণা ছিল, তা মূলত তাদের প্রতি আমাদের ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গির ফল। গবেষকদের মতে, ভেরোনিকার দীর্ঘ জীবন এবং মানুষের সাথে নিবিড় যোগাযোগ এই ধরনের আচরণ বিকাশে সহায়ক হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এখন সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা গবাদি পশুর এমন কোনো বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ দেখলে তা রিপোর্ট করেন। এই গবেষণাটি আমাদের গৃহপালিত পশুর মানসিক সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়নের জন্য একটি জোরালো বার্তা প্রদান করে।
উৎসসমূহ
DELFI
Smithsonian Magazine
EurekAlert! Science News
Sci.News
Defector
The Guardian
