ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্যে মার্কিন আধিপত্য: চীনের সস্তা জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নিকোলাস মাদুরোকে আটকের পর ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশল মূলত আমেরিকান স্বার্থ এবং তাদের অনুমোদিত বৈশ্বিক ট্রেডারদের অনুকূলে রপ্তানি প্রবাহকে পুনর্নির্দেশ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এই পদক্ষেপের ফলে চীন আগে যে বিশেষ ছাড়ে ভেনেজুয়েলার তেল সংগ্রহ করত, সেই অবাধ সুযোগ এখন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। মার্কিন প্রশাসন এখন থেকে ভেনেজুয়েলার সমস্ত জ্বালানি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করার অধিকার দাবি করছে, যা বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
এশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ভেনেজুয়েলার তেলের শেষ চালানগুলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কঠোর হওয়ার এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারের ঠিক আগে জাহাজে তোলা হয়েছিল। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিমাণ তেল চীনের ছোট শোধনাগার বা 'টিপট' (teapots) গুলোর জন্য মাত্র এক থেকে দুই মাসের চাহিদা মেটাতে পারবে। গত ডিসেম্বরে ঘোষিত মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে পরবর্তী চালানগুলো এখন কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে; চীনা ক্রেতাদের জন্য ভেনেজুয়েলার 'মেরে' (Merey) তেলের ডিসকাউন্ট প্রতি ব্যারেলে ১৫ ডলার থেকে কমে আইসিই ব্রেন্ট (ICE Brent) এর বিপরীতে মাত্র ৫ ডলারে নেমে এসেছে, যা চীনের জ্বালানি আমদানির খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বিশাল পরিবর্তনের সাথে সরাসরি জড়িত প্রধান পক্ষগুলো হলো মার্কিন সশস্ত্র বাহিনী, চীন এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পণ্য ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভিটোল গ্রুপ (Vitol Group) ও ট্রাফিগুরা গ্রুপ (Trafigura Group)। এই কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল বিপণনের জন্য মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে বিশেষ লাইসেন্স পেয়েছে, যা নতুন তেল প্রবাহের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ভিটোল গ্রুপের সিনিয়র ট্রেডার জন অ্যাডিসন এই লেনদেনগুলোতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। তবে তার রাজনৈতিক অনুদানের কারণে এখানে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। ভিটোল কর্তৃক কেনা প্রথম তেলের চালানটি ইতিমধ্যেই কুরাসাওয়ের বুলেন বে (Bullen Bay) টার্মিনালে খালাস করা হয়েছে, যা এই নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থার সূচনা নির্দেশ করে।
ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে ওলটপালট করে দিয়েছে এবং ভেনেজুয়েলায় বেইজিংয়ের বহু বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বিনিয়োগকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে 'ঋণের বিনিময়ে তেল' (oil-for-loans) ব্যবস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার বৃহত্তম ক্রেতা হিসেবে থাকলেও, এখন তারা বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যেই চীনা শোধনাগারগুলোকে কানাডিয়ান বা রাশিয়ান 'ইউরাল' (Urals) এর মতো আরও ব্যয়বহুল তেলের ওপর নির্ভর করতে হবে। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মেক্সিকো উপসাগরীয় উপকূলের শোধনাগারগুলোর জন্য ভেনেজুয়েলার ভারী তেলের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ এটি কানাডিয়ান তেলের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ী।
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত তীব্র ও মেরুকৃত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে তেলের বাণিজ্যের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের কথা ঘোষণা করলেও, চীন ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য মতে, প্রাথমিক বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ—যা প্রায় ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের সমান—শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টগুলোতে জমা রাখা হবে। এদিকে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই পুরো সামরিক ও বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং একে জাতিসংঘ সনদের একটি সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
1 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Business AM
Venezuelan Oil Trade Licenses: Policy Evolution and Market Dynamics - Discovery Alert
Blockade Politics: How U.S. Control of Venezuela Is Choking China's Oil Lifeline
Energy Security as Hierarchy: Venezuelan Oil in the US-China-Russia Triangle
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
