মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জেরে জ্বালানি সংকট: আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে তেল সরবরাহ বন্ধ করল কিউবা

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে কিউবা এক নজিরবিহীন এবং গভীরতর জ্বালানি সংকটের আবর্তে পড়েছে। দেশটির সরকারি কর্মকর্তারা এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ এবং অভ্যন্তরীণ তেলের মজুত আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়াকে দায়ী করেছেন। এই সংকটময় অবস্থা মোকাবিলায় কিউবা কর্তৃপক্ষ একটি জরুরি ঘোষণা জারি করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে পরবর্তী এক মাসের জন্য আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে 'জেট এ-১' (Jet A-1) নামক বিমান জ্বালানি সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হবে। মূলত দেশের সীমিত জ্বালানি সম্পদ সংরক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ জরুরি প্রয়োজন মেটাতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই আকস্মিক বিধিনিষেধের ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে দূরপাল্লার ফ্লাইটগুলোকে এখন তাদের গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য মেক্সিকো, বাহামা দ্বীপপুঞ্জ অথবা ডোমিনিকান রিপাবলিকের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে কারিগরি যাত্রাবিরতি নিতে হচ্ছে শুধুমাত্র জ্বালানি সংগ্রহের জন্য। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বেশ কিছু বিদেশি বিমান সংস্থা কিউবায় তাদের নির্ধারিত ফ্লাইটগুলো বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমানে কিউবায় আটকে পড়া প্রায় ৩,০০০ বিদেশি নাগরিককে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ 'ফেরি ফ্লাইট' বা খালি বিমান পাঠানো হচ্ছে। এই জ্বালানি সংকট দেশটির মোট নয়টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রভাব ফেলবে, যার মধ্যে রাজধানী হাভানার প্রধান প্রবেশদ্বার হোসে মার্টি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

কিউবার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রতিদিন প্রায় ১,১০,০০০ ব্যারেল তেলের প্রয়োজন হয়। দীর্ঘকাল ধরে ভেনিজুয়েলা ছিল কিউবার প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী, কিন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপে ২০২৫ সালে তারা মাত্র ৩০,০০০ ব্যারেল তেল সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে। সংকটের মাত্রা আরও তীব্র হয় যখন ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি মেক্সিকোও কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দেয়। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে, যারা হাভানাকে জ্বালানি দিয়ে সহায়তা করবে তাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। ফলস্বরূপ, গত এক দশকের মধ্যে এই প্রথম কিউবা কোনো দেশ থেকেই তেল আমদানি করতে পারছে না, যা দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কিউবার উপ-প্রধানমন্ত্রী অস্কার পেরেজ-অলিভা এই পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন যে, বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয়ের এই কঠোর ব্যবস্থাগুলো মূলত খাদ্য উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, বৈদেশিক বাণিজ্য সচল রাখা এবং দেশের মৌলিক পরিষেবাগুলো রক্ষা করাই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। তবে এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পড়তে শুরু করেছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে এবং শহরের ট্যাক্সি ভাড়াও বহুগুণ বেড়ে গেছে। জ্বালানি খরচ কমাতে সরকার বেশ কিছু বিলাসবহুল হোটেল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে এবং সরকারি দপ্তরের কার্যক্রমও সীমিত করা হয়েছে।

এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার সূত্রপাত হয় ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ ডিক্রিতে স্বাক্ষর করেন। এই ডিক্রির মাধ্যমে কিউবাকে তেল সরবরাহকারী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ৬ ফেব্রুয়ারি কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল এক বিবৃতিতে মার্কিন এই নীতিকে কিউবার অর্থনীতিকে 'পুরোপুরি শ্বাসরোধ' করার একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। অন্যদিকে, রাশিয়া এই পরিস্থিতিকে 'অত্যন্ত সংকটজনক' বলে বর্ণনা করেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান যে, কিউবাকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিবিড় আলোচনা চলছে।

পর্যটন খাতে এই সংকটের প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট। বর্তমানে কিউবায় প্রায় ৪,০০০ রুশ পর্যটক অবস্থান করছেন। যদিও অধিকাংশ পর্যটক পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ফিরছেন, তবে ৯ ফেব্রুয়ারি 'রোসিয়া' এয়ারলাইন্স তাদের মস্কো-হাভানা রুটের নিয়মিত ফ্লাইট বাতিল করে পর্যটকদের ফিরিয়ে আনার জন্য একটি বিশেষ খালি বিমান পাঠাতে বাধ্য হয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইন্না লিটভিনেঙ্কো পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, এই লজিস্টিক জটিলতা এবং জ্বালানি সংকটের কারণে বিমান টিকিটের দাম অদূর ভবিষ্যতে ৫০ শতাংশ বা তার বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিস্থিতি কিউবার পর্যটন শিল্পের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Diken

  • Diken

  • CGTN Türk

  • TRT Haber

  • Yeni Şafak

  • Yeni Ankara haber

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।