ইরানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারে ওয়াশিংটনে নেতানিয়াহুর জরুরি সফর
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন। এই সফরটি মূলত নির্ধারিত সময়ের এক সপ্তাহ আগেই সম্পন্ন করা হয়েছে, যা ইরানের সাথে নতুন করে শুরু হওয়া কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গুরুত্ব ও জরুরি অবস্থাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে। নেতানিয়াহুর এই বিশেষ মিশনের মূল লক্ষ্য হলো ট্রাম্প প্রশাসনকে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত চলমান আলোচনার পরিধি আরও বিস্তৃত করতে এবং কঠোর শর্তারোপ করতে রাজি করানো।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা নেতানিয়াহু দীর্ঘকাল ধরেই ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি বর্তমানে যেকোনো নতুন চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং 'ইরানি অক্ষ' হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের আর্থিক ও সামরিক সমর্থন বন্ধের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। ইসরায়েল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে তাদের পারমাণবিক হুমকির মতোই একটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট হিসেবে বিবেচনা করে। ইসরায়েলি নেতৃত্ব স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, তাদের নিরাপত্তার জন্য নির্ধারিত কোনো 'রেড লাইন' বা সীমা অতিক্রম করা হলে তারা আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়াই এককভাবে সামরিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ওমানের মাস্কাটে শাটল ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমে এই কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু হয়, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এমন এক উত্তপ্ত সময়ে এই আলোচনা চলছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে সরাসরি ইরানের উপকূলের দিকে মোতায়েন করা হয়েছে। ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদির মধ্যস্থতায় প্রথম দফার এই আলোচনাকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি একটি 'ভালো সূচনা' হিসেবে অভিহিত করেছেন। তবে আরাকচি একই সাথে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মৌলিক অধিকার থেকে কোনোভাবেই পিছপা হবে না, যা দীর্ঘকাল ধরে আলোচনার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভেন উইটকফ এবং এই প্রথমবার সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) প্রতিনিধি ব্র্যাড কুপার সরাসরি এই ধরনের কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণ করা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল নিয়ে বর্তমানে কিছুটা অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো কেবল নিষেধাজ্ঞার বিনিময়ে পারমাণবিক ছাড়ের ওপর ভিত্তি করে একটি সীমিত বা সংক্ষিপ্ত চুক্তিতে আগ্রহী হতে পারে। তবে এমন কোনো চুক্তি সম্পাদিত হলে ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোর কার্যক্রমের মতো ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, ইরান তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করতে শুরুতেই সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
২০২৫ সালের জুন মাসে ইরানি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলি বিমান হামলার পর এই নতুন সংলাপের পথ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুর এই সফরের প্রাক্কালে ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কার্যকরভাবে হ্রাসের বিষয়ে তাদের নিজস্ব কিছু অপারেশনাল বা কৌশলগত পরিকল্পনা আমেরিকার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউরি বোচারভ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানে পারমাণবিক হুমকি কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিই ভবিষ্যতে যেকোনো সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধ্বংসাত্মক কারণ হয়ে উঠতে পারে। নেতানিয়াহুর এই ওয়াশিংটন সফরের ফলাফলই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে যে আমেরিকা একটি সর্বাত্মক চুক্তির দিকে যাবে নাকি কেবল সীমিত পারমাণবিক চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ তারা মনে করে একটি অসম্পূর্ণ চুক্তি এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
12 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Owensboro Messenger-Inquirer
The Times of Israel
Middle East Eye
Reuters
The Guardian
Institute for the Study of War (ISW)
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।