শাওমি সাইবারওয়ান: বেইজিংয়ের ইভি কারখানায় রোবট 'ইন্টার্নদের' মাধ্যমে গাড়ি সংযোজন শুরু

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের মার্চের শুরুর দিকে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান শাওমি (Xiaomi) তাদের বেইজিং ভিত্তিক বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় এক অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী অপারেশনাল পরীক্ষা শুরু করেছে। এই পরীক্ষার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কোম্পানির নিজস্ব উদ্ভাবন, হিউম্যানয়েড রোবট 'সাইবারওয়ান' (CyberOne)। এই প্রাথমিক ধাপের পরীক্ষায় দুটি সাইবারওয়ান রোবটকে সরাসরি উৎপাদন লাইনে মোতায়েন করা হয়েছে, যেখানে তাদের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম প্রকৌশলগত কাজ সম্পন্ন করা। বিশেষ করে, গাড়ির চ্যাসিসে চাকার নাট (wheel nuts) নিখুঁতভাবে স্থাপন করার মতো উচ্চ-নির্ভুলতার কাজগুলো এই রোবটগুলোর মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে, যা সাধারণত অত্যন্ত দক্ষ মানব কর্মীদের দ্বারা করা হয়ে থাকে।

একটি নিবিড় তিন ঘণ্টার শিফটে এই রোবটগুলো তাদের কার্যকারিতা এবং সহনশীলতার প্রমাণ দিয়েছে। কারখানার স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট গতি বজায় রাখতে হয়েছিল, যেখানে প্রতি ৭৬ সেকেন্ডে একটি নতুন যানবাহন তৈরি সম্পন্ন হয়। এই অত্যন্ত দ্রুতগতির উৎপাদন চক্রের মধ্যে কাজ করে রোবট দুটি তাদের নির্ধারিত কাজের ৯০.২ শতাংশ সফলভাবে শেষ করতে সক্ষম হয়েছে। শাওমি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, এই মুহূর্তে এই রোবটগুলোকে পূর্ণাঙ্গ কর্মী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না; বরং তারা বর্তমানে 'ইন্টার্ন' বা শিক্ষানবিশ হিসেবে মূল্যায়নের স্তরে রয়েছে, যেখানে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

শাওমির প্রেসিডেন্ট লু ওয়েইবিং (Lu Weibing) এই প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরে নিশ্চিত করেছেন যে, রোবটগুলোকে ৭৬ সেকেন্ডের এই কঠোর উৎপাদন চক্রের সাথে শতভাগ মানিয়ে নেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য। উচ্চ-প্রযুক্তির এই সরণিতে সময়ের ব্যবধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, বর্তমান পর্যায়ে এক জোড়া দক্ষ মানব কর্মী হয়তো রোবটের তুলনায় কিছুটা দ্রুত এই নাট স্থাপনের কাজ করতে পারেন। তবে এই পরীক্ষার প্রকৃত সাফল্য কেবল গতির ওপর নির্ভর করছে না, বরং একটি শিল্প উৎপাদন পরিবেশে রোবটগুলো কতটা নির্ভরযোগ্যতা এবং নির্ভুলতার সাথে কাজ করতে পারে, তা যাচাই করাই ছিল এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য।

সাইবারওয়ান রোবটটি প্রথম ২০২২ সালে বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা হয়েছিল এবং বর্তমানে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই মডেলটি এখনও সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বাণিজ্যিক বাজারে অবমুক্ত করা হয়নি। এই রোবটের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মূলে রয়েছে শাওমি-রোবোটিক্স-০ (Xiaomi-Robotics-0) নামক একটি অত্যাধুনিক ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন (VLA) মডেল। এই সিস্টেমটি মাল্টিমোডাল পারসেপশন এবং রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের একটি জটিল সমন্বয় ব্যবহার করে কাজ করে। শারীরিক গঠনের দিক থেকে সাইবারওয়ান ১৭৭ সেন্টিমিটার লম্বা এবং এর ওজন ৫২ কেজি। এতে ২১টি ডিগ্রি অফ ফ্রিডম (DOF) রয়েছে, যা একে মানুষের মতো নমনীয়ভাবে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এতে থাকা মি-সেন্স (Mi-Sense) ডেপথ ভিশন মডিউলটি ৪৫ ধরনের মানুষের আবেগ এবং ৮৫ ধরনের পারিপার্শ্বিক শব্দ শনাক্ত করতে সক্ষম, যা একে পরিবেশের সাথে আরও বেশি মিথস্ক্রিয়াশীল করে তোলে।

শাওমির এই উদ্যোগের পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল কাজ করছে। তারা বাস্তব উৎপাদন ক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত তথ্য বা ডেটা ব্যবহার করে তাদের কন্ট্রোল সফটওয়্যারকে প্রতিনিয়ত আপডেট এবং উন্নত করছে। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) লেই জুন (Lei Jun) এর আগে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছিলেন, যেখানে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে কারখানার উৎপাদনে রোবটদের পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি এই উদীয়মান খাতে শাওমির বিশাল বিনিয়োগ এবং আগ্রাসী মনোভাবের পরিচয় দেয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারা বিশ্বে মোট ১৩,৩১৭টি হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি হয়েছিল, যার মধ্যে বিস্ময়করভাবে ৮৭ শতাংশই ছিল চীনা প্রস্তুতকারকদের তৈরি।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থা আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটস (RBC Capital Markets) একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস প্রদান করেছে। তাদের মতে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী হিউম্যানয়েড রোবটের বাজারের আকার ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে গিয়ে দাঁড়াবে। এই বিশাল বাজারের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশের বেশি অংশ চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানগুলো বিবেচনা করলে বোঝা যায় যে, শাওমির এই বর্তমান পরীক্ষাগুলো কেবল একটি কোম্পানির প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়, বরং এটি চীনের জাতীয় প্রযুক্তিগত আধিপত্য বিস্তার এবং বৈশ্বিক রোবোটিক্স বাজারে নেতৃত্ব দেওয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ।

এই রোবোটিক বিপ্লব ভবিষ্যতে শিল্প কারখানার চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। শাওমি তাদের এই 'ইন্টার্ন' রোবটগুলোর মাধ্যমে যে পথ দেখাচ্ছে, তা ভবিষ্যতে অন্যান্য শিল্পেও প্রয়োগ করা সম্ভব হবে। যদিও মানুষের দক্ষতা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তবুও সাইবারওয়ানের মতো রোবটগুলো ক্লান্তহীনভাবে এবং নিখুঁতভাবে কাজ করার মাধ্যমে উৎপাদনের গতিশীলতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। বেইজিংয়ের এই ইভি কারখানায় অর্জিত প্রতিটি ডেটা পয়েন্ট ভবিষ্যতে আরও উন্নত এবং দক্ষ রোবট তৈরির পথ প্রশস্ত করবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Hardware Upgrade

  • The Times of India

  • Investing.com

  • Futurism

  • TechRepublic

  • TechNode

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।