মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত অবসানের ট্রাম্পের ঘোষণায় তেলের বাজারে ধস: ৫ শতাংশের বেশি দরপতন
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
২০২৬ সালের ১০ মার্চ, মঙ্গলবার বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে এক নাটকীয় দরপতন প্রত্যক্ষ করা গেছে। আগের সেশনগুলোতে তেলের দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর পর এদিন তা ৫ শতাংশের বেশি হ্রাস পায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বিশেষ বিবৃতির পর এই বাজার সংশোধন শুরু হয়, যেখানে তিনি দাবি করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত খুব শীঘ্রই সমাপ্তির পথে রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান লক্ষ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত ও নিবিড় সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববাজারে অস্থিরতা চরমে উঠেছিল।
যদিও তেলের সরবরাহের ক্ষেত্রে মৌলিক ঝুঁকিগুলো এখনও বিদ্যমান, তবুও রাজনৈতিক আশাবাদের প্রভাবে তেলের দামের ওপর থাকা ভূ-রাজনৈতিক 'প্রিমিয়াম' বা বাড়তি মূল্য কমতে শুরু করেছে। গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১২:০২ মিনিটের দিকে দেখা যায়, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেল প্রতি ৬.৬৪ ডলার বা ৬.৭ শতাংশ কমে ৯২.৩২ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে মার্কিন মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) এর দাম ৫.৪৪ ডলার বা ৫.৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ব্যারেল প্রতি ৮৯.৩৩ ডলারে স্থির হয়। অথচ এর আগের দিন অর্থাৎ ৯ মার্চ, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছিল, যা ছিল গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্তর।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে দাবি করেন যে সামরিক অভিযান "নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত" গতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তবে যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র ছিল যথেষ্ট উদ্বেগজনক। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ স্পষ্ট করে বলেন যে, ১০ মার্চ হবে ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের "সবচেয়ে তীব্র ও শক্তিশালী হামলার দিন"। ট্রাম্পের এই আশাবাদী বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (IRGC) এক বিবৃতিতে জানায় যে, যুদ্ধ কখন শেষ হবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা কেবল তাদেরই রয়েছে। তারা আরও হুঁশিয়ারি দেয় যে, যদি হামলা অব্যাহত থাকে তবে তারা এই অঞ্চলের সমস্ত তেল রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দেবে।
জেপি মর্গানের (JPMorgan) বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, তেলের দাম সাময়িকভাবে কমলেও বাজারের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনও কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেলের মানদণ্ড যেমন মারবান (Murban) এবং দুবাই ক্রুড এখনও ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে লেনদেন হচ্ছে, যা নির্দেশ করে যে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি এখনও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। এর আগে এসবারসিআইবি (SberCIB) এর বিশ্লেষকরা পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের সরবরাহ ব্যাহত হবে। বিশ্ববাজারে এই বিশাল ঘাটতি পূরণের সক্ষমতা বর্তমানে নেই, যার ফলে মার্চ মাসে ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বাজারের এই চরম অস্থিরতা মোকাবিলায় জি-৭ (G7) ভুক্ত দেশগুলো তাদের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) থেকে তেল ছাড়ার প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। এই ঘোষণা বাজারকে কিছুটা ঠান্ডা করতে সহায়তা করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এর প্রভাব হবে সীমিত। কারণ বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশই পরিবাহিত হয় সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে, যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৫ সালের জুনে আলী খামেনির প্রয়াণ এবং মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, জ্বালানি বাজার রাজনৈতিক বিবৃতির প্রতি কতটা সংবেদনশীল।
৯ মার্চ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি টেলিফোন আলাপও বিনিয়োগকারীদের মনোভাবে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, পুতিন ইরান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ট্রাম্প পুতিনকে পরামর্শ দেন যেন তিনি ইরানের বদলে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের দিকে বেশি মনোনিবেশ করেন। ২০২৬ সালের ১০ মার্চের এই ঘটনাবলী পুনরায় প্রমাণ করল যে, বর্তমান বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তেলের বাজারের গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং এটি মূলত বড় দেশগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিবৃতির ওপর নির্ভরশীল।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Boursorama
Le Parisien
The Guardian
Libération
Sud Ouest
20 minutes
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



