২০২৭ সালের মধ্যে রুশ গ্যাস আমদানিতে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা: ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐতিহাসিক আইনি পদক্ষেপ

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) একটি যুগান্তকারী প্রবিধান চূড়ান্ত করেছে, যা রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর একটি পর্যায়ক্রমিক এবং অনির্দিষ্টকালের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২০২৫ সালের শেষভাগে অর্জিত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে এই আইনি পদক্ষেপটি নেওয়া হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা গ্যাস এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উভয়ই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি মূলত ইউরোপীয় ব্লকের জ্বালানি খাত থেকে রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ রুশ এলএনজি আমদানি সম্পূর্ণ বন্ধ করা হবে এবং পাইপলাইন গ্যাসের জন্য চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর।

নতুন এই প্রবিধানে কিছু নমনীয়তাও রাখা হয়েছে। যদি কোনো সদস্য রাষ্ট্র শীত মৌসুমের আগে তাদের গ্যাস মজুত বা স্টোরেজ পূর্ণ করতে প্রকৃত সমস্যার সম্মুখীন হয়, তবে তাদের জন্য ২০২৭ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছিল। হাঙ্গেরি এবং স্লোভাকিয়া, যারা এখনও রুশ জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তারা এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করেছে। হাঙ্গেরির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার সিজ্জার্তো এই সিদ্ধান্তকে "একটি বিশাল আইনি জালিয়াতি" হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন যে, হাঙ্গেরি এবং সম্ভবত স্লোভাকিয়া যৌথভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ জানাবে।

এই নিষেধাজ্ঞাটি মূলত 'REPowerEU' কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় অংশ, যার লক্ষ্য হলো রাশিয়া থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি নির্ভরতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণ মাত্রায় আগ্রাসনের পর এই কৌশলটি গ্রহণ করা হয়েছিল। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট গ্যাস আমদানির ৪০ শতাংশের বেশি আসত রাশিয়া থেকে। তবে ২০২৫ সালের মধ্যে এই অংশটি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ১৩-১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নরওয়ে ২৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম গ্যাস সরবরাহকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার অংশ মাত্র ১৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

নতুন এই প্রবিধান বাস্তবায়নে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং বৈচিত্র্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখন থেকে সদস্য দেশগুলোকে গ্যাস সরবরাহের অনুমতি দেওয়ার আগে তার উৎস নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদি কোনো কোম্পানি এই নতুন নিয়ম লঙ্ঘন করে, তবে তাদের ৪০ মিলিয়ন ইউরো পর্যন্ত জরিমানা বা তাদের মোট বৈশ্বিক বার্ষিক টার্নওভারের ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থদণ্ড গুণতে হতে পারে। তবে সরবরাহ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো জরুরি অবস্থা দেখা দিলে ইউরোপীয় কমিশন সর্বোচ্চ চার সপ্তাহের জন্য এই নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত করার ক্ষমতা রাখে। এর পাশাপাশি, ইউরোপীয় কমিশন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ রুশ তেল আমদানিও পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার জন্য একটি নতুন বিল প্রস্তাব করার পরিকল্পনা করছে।

'REPowerEU' পরিকল্পনার অধীনে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ৪৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ইউরোপ রাশিয়া থেকে জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই পরিবর্তনটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক দুর্বলতা তৈরি করতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সাহসী পদক্ষেপটি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • DIE WELT

  • Windward

  • Reuters

  • Urgewald

  • Eurostat

  • TVP World

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।