তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে ইরানি তেলের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় সাময়িক ছাড়

লেখক: Tatyana Hurynovich

২০ মার্চ মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ লাইসেন্স জারি করার ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে আগামী ৩০ দিনের জন্য ইরান থেকে তেল ও বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হয়েছে। তবে এই বিশেষ ছাড়ের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট শর্তারোপ করা হয়েছে; কেবল সেইসব তেলের চালানের ক্ষেত্রেই এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে যা ইতিমধ্যে জাহাজে বোঝাই করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা শুরু করেছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এই লাইসেন্সটি কোনোভাবেই নতুন কোনো বাণিজ্যিক চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদী লেনদেনের অনুমতি প্রদান করে না, বরং এটি কেবল চলমান সংকট মোকাবিলার একটি পথ।

ওএফএসি (OFAC)-এর এই নতুন লাইসেন্স অনুযায়ী, ২০ মার্চ পূর্ব সময় রাত ১২:০১ মিনিটের আগে জাহাজীকরণ করা প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল খালাস, বিক্রি এবং পরিবহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই পদক্ষেপটি বিশ্ববাজারের অস্থিরতা কমাতে এবং তেলের দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে, যেখানে ইরান সরাসরি কোনো আর্থিক সুবিধা পাবে না। একই সময়ে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের তেল উৎপাদন বাড়ানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। বেসেন্ট বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, এটি কোনোভাবেই নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘমেয়াদী শিথিলকরণ নয়, বরং সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট রোধ করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সমুদ্রপথ বা প্রণালী অবরোধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে এক নজিরবিহীন স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এই অবরোধের কারণে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার সরাসরি প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারের সীমা ছাড়িয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং জাপান ইতিপূর্বে ইরানের এই উস্কানিমূলক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA)-কে তাদের জরুরি মজুদ ব্যবহারের জন্য পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিল। তবে বাজারে তেলের এই বিশাল ঘাটতি দিন দিন আরও প্রকট হয়ে উঠছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, মার্কিন এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে ইরান সরকার সম্পূর্ণ ভিন্ন দাবি করেছে। দেশটির তেল মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক মুখপাত্র সামানা ঘোদ্দুসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করার মতো কোনো অতিরিক্ত তেলের মজুদ ইরানের কাছে নেই। তিনি আরও বলেন যে, মার্কিন অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণাটি মূলত বিশ্ববাজারের ক্রেতাদের মনে একটি মিথ্যা আশা জাগানোর কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়। ঘোদ্দুসির মতে, বর্তমানে সাগরে ভাসমান কোনো জাহাজে বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সরবরাহ কেন্দ্রে ইরানের এমন কোনো উদ্বৃত্ত তেল নেই যা দিয়ে বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য যে, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সময় মার্কিন অভিযানে তেহরানের তেল অবকাঠামোর একটি বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমোজগান টার্মিনালও অন্তর্ভুক্ত। ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে এক বক্তব্যে বলেছিলেন যে, ইরানের তেল শিল্পকে পুনরায় সচল করতে অন্তত ১০ বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে বর্তমান জাহাজ অবরোধের ফলে সৃষ্ট সংকট ওয়াশিংটনকে এই ধরনের একটি আপস বা সমঝোতায় আসতে বাধ্য করেছে। সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত মার্কিন এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও তারা স্পষ্ট করেছে যে, ইরানের ঘাটতি পূরণে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগতভাবে আরও ৩০ থেকে ৬০ দিন সময়ের প্রয়োজন হবে।

3 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।