পেন্টাগনের সাংবাদিক প্রবেশাধিকারের বিধিনিষেধ অসাংবিধানিক ঘোষণা করল মার্কিন আদালত

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ২০ মার্চ, শুক্রবার, ওয়াশিংটন ডিসির ফেডারেল বিচারক পল ফ্রিডম্যান মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন। এই রায়ে সাংবাদিকদের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধগুলোকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ কর্তৃক প্রবর্তিত এই নিয়মগুলোর বিরুদ্ধে 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস' আইনি লড়াই শুরু করেছিল, যার সফল সমাপ্তি ঘটল এই রায়ের মাধ্যমে।

সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক ফ্রিডম্যান তার পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন যে, বর্তমান নীতিটি মার্কিন সংবিধানের প্রথম এবং পঞ্চম সংশোধনীর মৌলিক অধিকারগুলোকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার গ্যারান্টি এখানে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বিতর্কিত এই নীতিতে সাংবাদিকদের কাছ থেকে একটি বিশেষ অঙ্গীকারনামা চাওয়া হয়েছিল, যেখানে বলা ছিল যে কোনো তথ্য প্রকাশের আগে পেন্টাগনের পূর্বানুমতি নিতে হবে, এমনকি যদি সেই তথ্য গোপনীয় বা ক্লাসিফাইড না-ও হয়। বিচারক এই ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, পেন্টাগনে প্রবেশাধিকার কোনো 'সুযোগ' বা প্রিভিলেজ নয়, বরং এটি সাংবাদিকদের একটি আইনগত অধিকার।

৪০ পৃষ্ঠার এই দীর্ঘ রায়ে বিচারক ফ্রিডম্যান সতর্ক করে দেন যে, অস্পষ্ট শব্দচয়ন ব্যবহার করে সরকার তার অপছন্দের সাংবাদিকদের বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই রায়ের গুরুত্ব অপরিসীম বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসন এবং ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিচারক মন্তব্য করেন যে, সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানার সুযোগ থাকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি এবং অপরিহার্য।

২০২৫ সালের শরৎকালে এই বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং রয়টার্সের মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদ সংস্থাগুলো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে সরাসরি অস্বীকার করেছিল। এর ফলে তাদের প্রেস পাস বা প্রবেশাধিকার বাতিল করা হয় এবং পেন্টাগনের প্রেস পুলে মূলত রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলোর আধিপত্য তৈরি হয়। তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এমন একপাক্ষিক পরিবর্তন ডোয়াইট আইজেনহাওয়ারের আমলের পর মার্কিন ইতিহাসে আর দেখা যায়নি, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

আদালত অবিলম্বে এই বিতর্কিত বিধানগুলো স্থগিত করার জন্য একটি স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন বা স্বীকৃতি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এনওয়াইটির মুখপাত্র চার্লি স্ট্যাডল্যান্ডার এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেন যে, এটি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং আমেরিকান জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তুলতে স্বাধীন গণমাধ্যমের অধিকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। অন্যদিকে, পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল এই রায়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করে জানান যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তারা দ্রুত এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার পরিকল্পনা করছেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং সাংবাদিক জুলিয়ান বার্নসের দায়ের করা এই মামলাটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং সংবিধান প্রদত্ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতার মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। আদালত মূলত পেন্টাগনের সেই প্রচেষ্টাকে রুখে দিয়েছে যা আইনি প্রক্রিয়ার বদলে প্রশাসনিক পূর্বানুমতির মাধ্যমে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। যদিও পেন্টাগনের ভেতরে সাংবাদিকদের চলাচলের ওপর কিছু সাধারণ প্রযুক্তিগত বিধিনিষেধ এখনো বহাল রয়েছে, তবে সংবাদের বিষয়বস্তু বা কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণের মূল বাধাটি এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে অপসারিত হলো।

3 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • AP News

  • CBS News

  • Reuters

  • The Guardian

  • The Wall Street Journal

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।