ওসলোর রোগীর স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর এইচআইভি থেকে মুক্তির দশম ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
বিশ্ব চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক যুগান্তকারী মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। নরওয়ের ওসলোর একজন রোগীর দেহে অ্যালোজেনিক হেমাটোপোয়েটিক স্টেম সেল স্থানান্তরের পর এইচআইভি ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদী এবং স্থিতিশীল মুক্তি বা রেমিশন লক্ষ্য করা গেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এটি দশম ঘটনা যেখানে এই পদ্ধতিতে একজন রোগীকে ভাইরাসমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। ৬৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি, যাকে বর্তমানে 'ওসলো রোগী' হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে, ২০০৬ সাল থেকে এইচআইভি সংক্রমণের সাথে লড়াই করছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে তার দেহে এক প্রকার আক্রমণাত্মক ব্লাড ক্যান্সার বা মাইলোডিসপ্লাস্টিক সিনড্রোম ধরা পড়ে।
২০২০ সালে ক্যান্সারের চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা হয়। এই অত্যন্ত জটিল অস্ত্রোপচারটি কেবল তার ক্যান্সারকেই নিয়ন্ত্রণে আনেনি, বরং এইচআইভি সংক্রমণের ওপরও দীর্ঘমেয়াদী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সাফল্যের নেপথ্যে মূল চাবিকাঠি ছিল দাতার সাথে তার অনন্য জেনেটিক সামঞ্জস্য। উল্লেখযোগ্য যে, এই দাতা ছিলেন রোগীর নিজের বড় ভাই। ওসলো ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, দাতা একটি বিরল জেনেটিক মিউটেশন বহন করছিলেন, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে CCR5Δ32/Δ32 নামে পরিচিত।
এই বিরল মিউটেশনটি কোষের CCR5 রিসেপ্টর প্রোটিনকে অকেজো করে দেয়। সাধারণত এইচআইভি-১ ভাইরাস এই রিসেপ্টরটিকে ব্যবহার করে মানুষের সিডি৪+ টি-কোষে প্রবেশ করে। এই মিউটেশনের ফলে ভাইরাস কোষে প্রবেশের পথ পায় না, যা প্রাকৃতিকভাবেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যেখানে প্রথম বছরে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকে ১০% থেকে ২০% পর্যন্ত। তবে সফল অস্ত্রোপচারের দুই বছর পর রোগী তার অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সক্ষম হন।
২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল বিখ্যাত সাময়িকী 'নেচার মাইক্রোবায়োলজি'-তে (Nature Microbiology) এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। প্রধান গবেষক ডক্টর অ্যান্ডার্স আইভিন্দ মাইরে জানিয়েছেন যে, বর্তমানে রোগীর শরীরে ভাইরাসের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, তার দেহে এইচআইভি-বিরোধী অ্যান্টিবডির মাত্রা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট টি-সেল প্রতিক্রিয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই। এটি প্রমাণ করে যে তার শরীর থেকে এই রোগের জৈবিক স্মৃতি কার্যত মুছে গেছে। গবেষকরা রোগীর অস্থিমজ্জা এবং অন্ত্রের টিস্যুতেও 'ফুল কাইমেরিজম' বা দাতার কোষ দ্বারা রোগীর রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন লক্ষ্য করেছেন।
ওসলো রোগীর এই ঘটনাটি ২০০৯ সালের 'বার্লিন রোগী'র মতো পূর্ববর্তী সফল উদাহরণগুলোর তালিকায় নতুন সংযোজন। স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে এই বিশেষ CCR5Δ32/Δ32 মিউটেশন প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় একজনের দেহে পাওয়া যায়। তবে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এবং ইসিএসটিইএম (IciStem) কনসোর্টিয়ামের সদস্যরা সতর্ক করেছেন যে, স্টেম সেল ট্রান্সপ্ল্যান্ট লক্ষ লক্ষ এইচআইভি রোগীর জন্য কোনো মাপযোগ্য সমাধান হতে পারে না। এটি একটি অত্যন্ত আক্রমণাত্মক পদ্ধতি এবং এতে 'গ্রাফ্ট-ভার্সাস-হোস্ট' প্রতিক্রিয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি থাকে, যা ওসলো রোগী নিজেও মোকাবিলা করেছেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বর্তমান লক্ষ্য হলো এই জেনেটিক প্রতিরোধের প্রভাবকে আরও সহজ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে সাধারণ রোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এর জন্য বর্তমানে জিন প্রকৌশল বা জিন এডিটিং প্রযুক্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো CCR5 মিউটেশনের মতো একই ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা, যা ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো কঠিন ঝুঁকি ছাড়াই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের সুস্থ করে তুলতে পারবে। এই উদ্ভাবনী গবেষণাগুলো ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে এইচআইভি নির্মূলে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
2 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Live Science
Ground News
Cadena Politica
El Tiempo de Monclova
এই বিষয়ে আরও নিবন্ধ পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।



