১৭ এপ্রিল বাজারে আসছে ইলোন মাস্কের নতুন অ্যাপ XChat: নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ইলোন মাস্কের নেতৃত্বাধীন এক্স (X) কর্পোরেশন তাদের যোগাযোগের দুনিয়ায় এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে ‘XChat’ নামক একটি স্বতন্ত্র মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন লঞ্চ করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। এই অ্যাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বাজারে আসবে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। শুরুতে এটি শুধুমাত্র অ্যাপল ব্যবহারকারীদের জন্য অ্যাপ স্টোরে পাওয়া যাবে, যা আইওএস (iOS) এবং আইপ্যাডওএস (iPadOS) প্ল্যাটফর্মে কার্যকর হবে। মাস্কের এই উদ্যোগ মূলত চীনের বিখ্যাত উইচ্যাটের (WeChat) আদলে একটি সর্বজনীন ‘সুপার-অ্যাপ’ তৈরির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ। এই অ্যাপের মাধ্যমে এক্স প্ল্যাটফর্মটি যোগাযোগ, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং বিবিধ সেবা প্রদানের একটি সমন্বিত কেন্দ্রে পরিণত হতে চাইছে।

XChat-এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ব্যবহারকারী বান্ধব লগ-ইন পদ্ধতি, যা বর্তমানের অনেক জনপ্রিয় অ্যাপ থেকে আলাদা। এখানে ব্যবহারকারীদের নিজস্ব ফোন নম্বর প্রদানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; শুধুমাত্র বিদ্যমান এক্স (X) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই সেবাটি উপভোগ করা যাবে। নিরাপত্তার খাতিরে এতে এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন, স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুছে যাওয়া মেসেজ (self-destructing messages) এবং এমনকি কথোপকথনের স্ক্রিনশট নেওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। গ্রুপ চ্যাটের ক্ষেত্রেও এটি বেশ উদার, যেখানে সর্বোচ্চ ৪৮১ জন সদস্য একসাথে যুক্ত হতে পারবেন। ডেভেলপাররা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে এটি সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপনমুক্ত থাকবে এবং এতে কোনো ব্যবহারকারীকে ট্র্যাকিং করা হবে না।

অ্যাপটির প্রযুক্তিগত ভিত্তির দিকে তাকালে দেখা যায় এটি ‘রাস্ট’ (Rust) নামক আধুনিক প্রোগ্রামিং ভাষা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে, যা এর দ্রুতগতি এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ব্যবহারের জন্য আইওএস ১৬ বা তার পরবর্তী কোনো সংস্করণের প্রয়োজন হবে। ২০২৫ সালের মে মাসে এর অভ্যন্তরীণ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে আইওএস ব্যবহারকারীদের জন্য পাবলিক বিটা সংস্করণ উন্মুক্ত করা হয়েছে। এক্স প্ল্যাটফর্মের প্রায় ৫০০ মিলিয়নেরও বেশি সক্রিয় মাসিক ব্যবহারকারী থাকায় XChat দ্রুত একটি বিশাল ব্যবহারকারী গোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এটি মূলত ব্যবহারকারীদের একটি নিরাপদ এবং বিজ্ঞাপনমুক্ত পরিবেশ দেওয়ার লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছে।

তবে এই উচ্চাভিলাষী বিপণন প্রচারের আড়ালে কিছু বিতর্কও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে ‘নো ট্র্যাকিং’ বা ট্র্যাকিংহীনতার দাবি করা হলেও অ্যাপল অ্যাপ স্টোরের গোপনীয়তা সংক্রান্ত নথিতে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে যে XChat ব্যবহারকারীর ভৌগোলিক অবস্থান (প্রক্সিমিটি লোকেশনসহ), পরিচিতি তালিকা (কন্টাক্টস), সার্চ হিস্ট্রি এবং ডিভাইসের আইডেন্টিফায়ার বা শনাক্তকারীর মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবে। এই ডেটা সংগ্রহের তথ্যটি মূলত কোম্পানির ‘জিরো ট্র্যাকিং’ দাবির বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে ‘নো ট্র্যাকিং’ মানেই ডেটা সংগ্রহ না করা নয় এবং মেটাডেটা সংগ্রহের এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, XChat-এর এই হাই-টেক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং এর প্রচারণার মধ্যে এক ধরনের অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ইলোন মাস্কের পক্ষ থেকে ‘বিটকয়েন-শৈলীর এনক্রিপশন’ ব্যবহারের যে কথা বলা হয়েছে, তার বিস্তারিত কোনো প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এর পাশাপাশি, লঞ্চের তারিখ ঘোষণা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য থার্ড-পার্টি বা স্বতন্ত্র নিরাপত্তা সংস্থা এই অ্যাপটির অডিট বা নিরাপত্তা যাচাইকরণ সম্পন্ন করেনি। ফলে গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার প্রকৃত মানদণ্ড যাচাই করতে ব্যবহারকারীদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এক্স কর্পোরেশনের এই নতুন পদক্ষেপ মেসেজিং অ্যাপের বাজারে কতটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারে, তা এখন বড় একটি পর্যালোচনার বিষয়।

11 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Bild

  • Forbes

  • TradingKey

  • CGTN

  • 9to5Mac

  • Lifehacker Australia

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।