হার্ভার্ডের নতুন উদ্যোগ: ‘জ্বালানি, জলবায়ু ও পরিবেশ’ বিষয়ক বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা

সম্পাদনা করেছেন: an_lymons

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়

হার্ভার্ড কলেজ জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে তারা ‘এনার্জি, ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (Energy, Climate, and Environment — ENCE) নামে একটি নতুন বিশেষায়িত পাঠ্যক্রম চালু করতে যাচ্ছে। এই প্রোগ্রামটি প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এবং মানবিক শাখার সমন্বয়ে একটি বহুমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে, যা বর্তমান বিশ্বের জটিল পরিবেশগত ও জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।

এই নতুন শিক্ষা উদ্যোগটি দীর্ঘ কয়েক বছরের আন্তঃবিভাগীয় আলোচনার ফসল। এটি বর্তমানে বিদ্যমান ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পাবলিক পলিসি’ (Environmental Science and Public Policy — ESPP) প্রোগ্রামের একটি মানবিক বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। এর মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের কেবল প্রযুক্তিগত জ্ঞান নয়, বরং পরিবেশগত সমস্যার সামাজিক ও মানবিক দিকগুলো গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করা।

ENCE প্রোগ্রামের প্রবর্তন মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে হার্ভার্ডের কৌশলগত অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন। ২০২৬ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের যে লক্ষ্য বিশ্ববিদ্যালয়টি নির্ধারণ করেছে, এই শিক্ষা কার্যক্রম সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

এই প্রোগ্রামের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে ‘ENCE 10: এ গাইড টু এনার্জি, ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ নামক একটি বিশেষ কোর্স। এটি যৌথভাবে তৈরি করেছেন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেসন বেকফিল্ড, পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক লেনে ভি. হাউ এবং ইতিহাসের অধ্যাপক জয়েস ই. চ্যাপলিন। অধ্যাপক হাউয়ের মতে, জলবায়ু ও জ্বালানি সংকটের কার্যকর সমাধানের জন্য বিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞানের মধ্যে একটি শক্তিশালী সমন্বয় বা সিনার্জি প্রয়োজন।

এই শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস অনুষদ (FAS) চারটি বিশেষায়িত বিভাগ বা ‘ট্র্যাক’ অন্তর্ভুক্ত করেছে। এগুলো হলো:

  • টেকসই সমাধানের জন্য বিজ্ঞান ও প্রকৌশল;
  • প্রকৃতি, নীতিশাস্ত্র এবং মানুষের কল্পনা;
  • বাজার, রাজনীতি এবং সমাজ;
  • জীববৈচিত্র্য এবং জলবায়ু বিজ্ঞান।

প্রতিটি শিক্ষার্থী তাদের পছন্দের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি তারা অন্যান্য বিষয়ের সাথেও পরিচিত হবেন যাতে ভবিষ্যতে তারা বিভিন্ন পেশাদার দলের সাথে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারেন। এই কোর্সের একটি অন্যতম প্রধান অংশ হলো ‘ক্যাপস্টোন প্রজেক্ট’ (Capstone Project), যেখানে শিক্ষার্থীরা আন্তঃবিভাগীয় দলে বিভক্ত হয়ে বাস্তব জীবনের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পাবেন।

ENCE প্রোগ্রামটি হার্ভার্ডের বিদ্যমান অন্যান্য প্রোগ্রাম যেমন ESPP এবং ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং’ (ESE)-এর পাশাপাশি পরিচালিত হবে। এটি শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত করবে। যেখানে ESPP মূলত বিজ্ঞান ও সরকারি নীতির ওপর জোর দেয়, সেখানে ENCE মানবিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বেশি গুরুত্ব প্রদান করে।

বিশেষ করে ‘প্রকৃতি, নীতিশাস্ত্র এবং মানুষের কল্পনা’ ট্র্যাকটি শিক্ষার্থীদের পরিবেশের নৈতিক ও কাল্পনিক দিকগুলো নিয়ে ভাবতে শেখাবে। অন্যদিকে, ‘বাজার, রাজনীতি এবং সমাজ’ ট্র্যাকটি অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জলবায়ু নীতি বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করবে। এছাড়া ‘টেকসই সমাধানের জন্য বিজ্ঞান ও প্রকৌশল’ বিভাগটি স্কুল অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (SEAS)-এর কোর্সের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকবে।

হার্ভার্ডের এই শিক্ষামূলক উদ্যোগের পাশাপাশি তারা কার্বন নিঃসরণ কমাতেও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়টি তাদের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করেছে। এটি তাদের ২০৫০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত হওয়ার ‘গোল জিরো’ (Goal Zero) লক্ষ্যমাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে হার্ভার্ড এমআইটি (MIT) এবং মাস জেনারেল ব্রিগ্যামের সাথে যৌথভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে টেক্সাসে ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং উত্তর ডাকোটায় ২০৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যেই ক্যাম্পাসের শতভাগ বিদ্যুতের চাহিদা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে মেটানো সম্ভব হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ENCE কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে হার্ভার্ড এমন এক নতুন প্রজন্মের বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে চায় যারা পরিবেশ, জ্বালানি এবং সামাজিক উন্নয়নের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে কাজ করতে সক্ষম। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বব্যাপী একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার ক্ষেত্রে তার একাডেমিক ও ব্যবহারিক নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করছে এবং শিক্ষার্থীদের আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করছে।

19 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Harvard Crimson

  • The Salata Institute

  • Harvard University

  • illuminem

  • Harvard University

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।