অ্যাটর্নি জেনারেল পেম বন্ডি প্রতিনিধিদের হাউস-অফ-রিপ্রেজেন্টেটিভসের শুনানিতে সাক্ষ্য দিচ্ছেন।
২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাম বন্ডি কুখ্যাত জেফরি এপস্টাইন মামলা সংক্রান্ত সমস্ত নথিপত্র জনসমক্ষে আনার ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, এপস্টাইন ফাইল ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট বা ইএফটিএ (EFTA) এর শর্তাবলী মেনেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই ঘোষণাটি ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত নথির একটি বিশাল সংগ্রহের ধারাবাহিকতায় এসেছে। তবে হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির সদস্যসহ অনেক সমালোচকই এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, প্রকাশিত নথির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও গোপন রাখা হয়েছে অথবা এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে যা তথ্যের মূল নির্যাসকে আড়াল করে।
ইএফটিএ আইনটি ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের মাধ্যমে কার্যকর হয়েছিল। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিচার বিভাগকে (DOJ) বাধ্য করা যাতে তারা জেফরি এপস্টাইন এবং গিসলেন ম্যাক্সওয়েল সম্পর্কিত সমস্ত অ-গোপনীয় নথি ৩০ দিনের মধ্যে প্রকাশ করে। প্যাম বন্ডি জুডিশিয়ারি কমিটির কাছে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক পত্রে এপস্টাইনের মানব পাচার কার্যক্রম এবং তার আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ সম্বলিত রেকর্ডগুলো হস্তান্তর করার কথা জানান। এই নথিতে ৩০০-এর বেশি প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে, যার মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারাক ও মিশেল ওবামা, প্রিন্স হ্যারি এবং বিল গেটসের মতো বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নাম রয়েছে। বন্ডি জোর দিয়ে বলেছেন যে, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে কোনো তথ্য গোপন করা হয়নি, তবে তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কিছু অংশ মুছে ফেলা হয়েছে।
এই আইনি প্রক্রিয়ার নেপথ্যে ছিলেন কংগ্রেস সদস্য টমাস ম্যাসি, যিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এই বিলটি পাসের জন্য একটি বিশেষ পিটিশন দাখিল করেছিলেন। তার এই উদ্যোগে ২১৮ জন সদস্যের সমর্থন পাওয়ার পর হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসে ৪২৭-১ ভোটে বিলটি পাস হয় এবং পরবর্তীতে সেনেটে এটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। বিচার বিভাগ প্রাথমিকভাবে দাবি করেছিল যে তারা ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ৩.৫ মিলিয়ন পৃষ্ঠা প্রকাশের মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে, এই মামলার মোট নথির পরিমাণ ৬ মিলিয়ন পৃষ্ঠারও বেশি। এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার পর্যালোচনা করার জন্য বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে ৫০০-এর বেশি আইনজীবী এবং বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, যাতে ভুক্তভোগীদের পরিচয় কোনোভাবেই প্রকাশ না পায়।
প্যাম বন্ডির এই ঘোষণাটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিয়ে চারদিকে তীব্র সমালোচনা চলছে। অনেক বিশেষজ্ঞ এই নথি প্রকাশের প্রক্রিয়াটিকে একটি 'চরম ব্যর্থতা' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কারণ এতে তথ্যের ব্যাপক কাটছাঁট করা হয়েছে। টমাস ম্যাসি অভিযোগ করেছেন যে, বিচার বিভাগ 'অ্যাটর্নি-ক্লায়েন্ট প্রিভিলেজ' এবং 'ওয়ার্ক প্রোডাক্ট ডকট্রিন' এর মতো আইনি অজুহাত দেখিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ড আটকে রেখেছে। ২০২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন নথির ভিত্তিতে কেবল ম্যাক্সওয়েল, এপস্টাইন এবং জাঁ-লুক ব্রুনেলের নামই প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে রয়ে গেছে। উল্লেখ্য যে, ব্রুনেল ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্যারিসের একটি কারাগারে বন্দি অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নথিপত্র প্রকাশের প্রভাব বেশ জোরালোভাবে অনুভূত হচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এই নতুন তথ্যের ভিত্তিতে নিজস্ব তদন্ত শুরু করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে এক ধরনের ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ফ্রান্সের সাবেক মন্ত্রী জ্যাক ল্যাং তার নাম নথিতে আসার পর ইনস্টিটিউট অফ দ্য আরব ওয়ার্ল্ডের প্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই নথির প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী।
পরিশেষে, জেফরি এপস্টাইন মামলাটি কেবল একটি অপরাধের বিচার নয়, বরং এটি বিশ্বজুড়ে প্রভাবশালী মহলের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার একটি বড় পরীক্ষা। যদিও ইএফটিএ আইনের মাধ্যমে অনেক তথ্য সামনে এসেছে, তবুও পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার এবং অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করার এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন বিচার বিভাগের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর দিকে। এই নথিপত্রগুলো ভবিষ্যতে আরও অনেক অজানা সত্যকে সামনে নিয়ে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যা হয়তো বিশ্ব রাজনীতির অনেক সমীকরণ বদলে দিতে পারে।