মহাবিশ্বের প্রাচীনতম উপাদান—পরমাণু—এবং ক্ষণস্থায়ী মানব জীবনের মধ্যেকার বৈসাদৃশ্য আমাদের অস্তিত্বের গভীরতম রহস্যগুলির মধ্যে অন্যতম। একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো, আমাদের দেহের প্রায় সমস্ত পরমাণুর উৎপত্তি প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে, যা মহাবিশ্বের শুরুর কাছাকাছি সময়ে ঘটেছিল। এই উপাদানগুলি মানবজাতির বিলুপ্তির পরেও টিকে থাকবে, কারণ পদার্থ সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না, যা পদার্থের নিত্যতার সূত্র মেনে চলে।
মহাবিশ্বের সূচনা বিগ ব্যাং তত্ত্ব অনুসারে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে হয়েছিল, এবং এই প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট মৌলিক কণাগুলি একত্রিত হয়ে পরমাণু গঠন করে। বর্তমানে আমাদের রক্তে বিদ্যমান এই হাইড্রোজেন পরমাণুগুলি পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও হাইড্রোজেন হিসেবেই বিরাজ করবে। এই চিরন্তন উপাদান দ্বারা গঠিত জীবন কেন অমর নয়, এই প্রশ্নটিই কেন্দ্রীয় রহস্য হিসেবে সামনে আসে। বিজ্ঞান নির্দেশ করে যে জীবন কেবল বস্তু নয়, বরং সেই বস্তুর একটি সুনির্দিষ্ট এবং জটিল সংগঠন মাত্র।
জীবন্ত সত্তাগুলি পারমাণবিক স্তরে একটি অবিশ্বাস্য বিন্যাস বজায় রাখে, যার মধ্যে রয়েছে স্ব-প্রতিলিপিকারী অণু, সক্রিয় বিপাক প্রক্রিয়া এবং নিরন্তর মেরামত ব্যবস্থা। এই ভঙ্গুর স্থাপত্যকে মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলার দিকে স্বাভাবিক প্রবণতা, অর্থাৎ এনট্রপি, এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য অবিরাম শক্তির প্রয়োজন হয়। অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্ট বেতুল কাচার এই সাংগঠনিক জটিলতার গুরুত্ব তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন যে, "জীবন হলো এমন রসায়ন যার স্মৃতি আছে"। যখন শক্তির প্রবাহ থেমে যায়, তখন এই সুনির্দিষ্ট বিন্যাসটি ভেঙে পড়ে; বস্তুত, যা বিলীন হয় তা হলো উপাদানের বিন্যাস, উপাদানটি নয়।
এই ধারণাটি মহাজাগতিক প্রেক্ষাপটে জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতিকে স্পষ্ট করে তোলে। একটি জীবদেহ যখন মারা যায়, তখন তার উপাদানগুলির কোনো ধ্বংস ঘটে না; বরং সেগুলি ছত্রাক বা পাললিক শিলা তৈরির মতো নতুন কাঠামোতে পুনর্বিন্যস্ত হয়। যা অদৃশ্য হয়ে যায় তা হলো সেই নির্দিষ্ট, সুসংগঠিত রূপ যা আমরা 'স্ব' হিসেবে শনাক্ত করি; সুতরাং, নশ্বরতা বস্তুটির উপর নয়, বরং পরিচয়ের উপর আরোপিত হয়। পৃথিবীর বয়স প্রায় ৪.৫৪ বিলিয়ন বছর, যা মহাজাগতিক পরমাণুর তুলনায় অনেক কম সময়ের জন্য এই বিশেষ বিন্যাসটিকে ধারণ করে রেখেছে।
এই বৈসাদৃশ্যের চূড়ান্ত দিকটি হলো, যে উপাদানগুলি মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন থেকে টিকে আছে, তারাই এখন নিজেদের বিলুপ্তি নিয়ে চিন্তা করার মতো একটি কাঠামো তৈরি করেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী অ্যাডাম রিয়েসের মতো বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের বয়স নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, পূর্বের ধারণা ১৩.৮ বিলিয়ন বছর থেকে এটি কিছুটা কমও হতে পারে, যা এই মহাজাগতিক সময়সীমার আপেক্ষিকতাকে আরও জোরদার করে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে অমর না হলেও, আমাদের শরীর এমন উপাদান দিয়ে গঠিত যা অমরত্বের কাছাকাছি। আমরা সেই বিরল মহাজাগতিক ঘটনা, যা বিগ ব্যাং-এর পরমাণু দ্বারা গঠিত এবং যারা কেন সবকিছু মরে যায়, সেই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করতে শিখেছে। এই ধারণাটি আমাদের অস্তিত্বকে মহাবিশ্বের বৃহত্তর, অনন্ত প্রক্রিয়ার একটি অংশ হিসেবে স্থাপন করে, যেখানে পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক।



