এই নতুন ছবিতে, হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দ্বারা নেওয়া HH 80/81–এর একটি জোড়া দেখা যাচ্ছে, Herbig–Haro অবজেক্টসমূহ।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে নক্ষত্র গঠনের চরম পর্যায় সম্পর্কে অত্যন্ত বিশদ এবং উচ্চ-রেজোলিউশন সম্পন্ন তথ্য সরবরাহ করেছে। এই গবেষণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রোটোস্টার বা আদি-নক্ষত্র IRAS 18162-2048 থেকে নির্গত একটি শক্তিশালী এবং বিস্ময়কর উদ্গিরণ। এই নক্ষত্রটি L291 নামক একটি বিশাল আণবিক মেঘের মধ্যে অবস্থিত সবচেয়ে ভারী এবং প্রভাবশালী নক্ষত্র হিসেবে পরিচিত। পৃথিবী থেকে প্রায় ৫৫০০ আলোকবর্ষ দূরে ধনু রাশিতে (Sagittarius) অবস্থিত এই অঞ্চলটি বর্তমানে মহাকাশ বিজ্ঞানের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌতূহলোদ্দীপক গবেষণার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বিজ্ঞানীরা এই প্রোটোস্টার থেকে নির্গত গ্যাসের তীব্র প্রবাহ বা নাক্ষত্রিক জেটের গতি দেখে রীতিমতো বিস্মিত হয়েছেন, যা এ পর্যন্ত মহাকাশ বিজ্ঞানে পর্যবেক্ষণ করা সমস্ত নাক্ষত্রিক প্রবাহের মধ্যে গতির এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। এই প্রবাহের নির্দিষ্ট কিছু অংশ প্রতি সেকেন্ডে ১০০০ কিলোমিটারেরও বেশি গতিতে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা ঘণ্টায় প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন কিলোমিটারের এক অবিশ্বাস্য গতির সমান। শুধু গতিই নয়, এই জেটটি দৈর্ঘ্যের দিক থেকেও এ যাবৎকালের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এটি মহাকাশে প্রায় ৩২ আলোকবর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত, যা আমাদের সম্পূর্ণ সৌরজগতের ব্যাসের চেয়ে প্রায় আট থেকে দশ গুণ বেশি বড়। ঘূর্ণন অক্ষ বরাবর নির্গত এই ধরনের মেরু প্রবাহ মহাবিশ্বের অনেক নক্ষত্রমন্ডলীতে দেখা গেলেও, IRAS 18162-2048 এর এই বিশাল আকার এবং তীব্রতা একে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলেছে।
IRAS 18162-2048 নামক এই প্রোটোস্টারটির ভর আমাদের সূর্যের ভরের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি, যা একে একটি বিশাল এবং শক্তিশালী তরুণ নক্ষত্রের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এর সামগ্রিক উজ্জ্বলতা সূর্যের তুলনায় প্রায় ১৭,০০০ গুণ বেশি বলে ধারণা করা হয়। হাবল টেলিস্কোপের পাঠানো অত্যাধুনিক ছবিতে হারবিগ-হারো (HH) ৮০ এবং HH ৮১ নামক দুটি মহাজাগতিক বস্তু স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে, যা মহাকাশে উজ্জ্বল সবুজ এবং গোলাপী রঙের এক অপূর্ব আভা ছড়াচ্ছে। এই উজ্জ্বল এবং রঙিন কাঠামোগুলো মূলত জেটের উচ্চ-গতির গ্যাসের সাথে আগে থেকে সেখানে বিদ্যমান পদার্থের প্রচণ্ড সংঘর্ষের ফলে তৈরি হয়। এই সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট শক্তিশালী ঘাত তরঙ্গ বা শক ওয়েভ আন্তঃনাক্ষত্রিক মেঘকে প্রচণ্ড উত্তপ্ত করে তোলে এবং এই ধরনের দৃশ্যমান আলোর বিচ্ছুরণ ঘটায়।
HH 80 এবং HH 81 নামক এই বস্তুগুলো তাদের অস্বাভাবিক উজ্জ্বলতার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত এবং এগুলো একটি বিশাল তরুণ নক্ষত্র থেকে ক্রমাগত শক্তি সংগ্রহ করে চলেছে। সাধারণত এই ধরনের হারবিগ-হারো বস্তুগুলো কম ভরের নক্ষত্রের সাথে সম্পর্কিত থাকলেও, এই ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি শক্তিশালী। এই প্রোটোস্টারের চারপাশের তীব্র চৌম্বক ক্ষেত্র নক্ষত্রের চারপাশের অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে পদার্থকে সংগ্রহ করে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবল বেগে চালিত করে, যা শেষ পর্যন্ত এই শক্তিশালী জেটের জন্ম দেয়। উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছিলেন যে, HH 80–81 জেট থেকে মেরুকৃত রেডিও তরঙ্গ নির্গত হয়। এটিই ছিল মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম প্রমাণ যে কোনো প্রোটোস্টারের একটি সুসংগঠিত চুম্বকীয় জেট রয়েছে, যার চৌম্বক ক্ষেত্রের তীব্রতা প্রায় ২০ ন্যানোটেসলা (nT) হিসেবে পরিমাপ করা হয়েছে।
হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে পরিচালিত বর্ণালী পর্যবেক্ষণ এবং উচ্চ-মানের ছবিগুলো বিজ্ঞানীদের এই জেটের সঠিক গতিবিধি এবং দিক পরিবর্তন পরিমাপ করতে অভূতপূর্ব সাহায্য করেছে। ১৯৯৫, ২০১৮ এবং ২০২৬ সালে বিভিন্ন সময়ে তোলা ছবিগুলোর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ বিজ্ঞানীদের এই জটিল নাক্ষত্রিক কাঠামোর বিবর্তন এবং এর অভ্যন্তরীণ গতিবিদ্যা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে। এই ধরনের মহাজাগতিক ঘটনাগুলো বিশদভাবে অধ্যয়নের মাধ্যমে মহাবিশ্বের বিশাল নক্ষত্র গঠনের নেপথ্যে থাকা শক্তিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। একই সাথে, এই জেটগুলো কীভাবে নক্ষত্রের চারপাশের ডিস্ক থেকে অতিরিক্ত কৌণিক ভরবেগ অপসারণ করে এবং নক্ষত্রের ভর বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা বুঝতেও এই গবেষণাটি অত্যন্ত সহায়ক এবং তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।