বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিসীমায় 45টি সম্ভাব্য এক্সোপ্ল্যানেট রয়েছে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ল সেগান ইনস্টিটিউটের জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মহাকাশে প্রাণের অস্তিত্ব অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন। তারা ৬০০০-এরও বেশি পরিচিত বহির্গ্রহ বা এক্সোপ্ল্যানেটের একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে সেগুলোকে ফিল্টার করেছেন। ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ 'Monthly Notices of the Royal Astronomical Society' নামক মর্যাদাপূর্ণ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ৪৫টি পাথুরে গ্রহকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই গ্রহগুলো তাদের নিজ নিজ নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত, যেখানে তাত্ত্বিকভাবে তরল পানি থাকার উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান।
কার্ল সেগান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক লিসা কাল্টেনেগার উল্লেখ করেছেন যে, এই নতুন তালিকাটি আগামী দিনের মহাকাশ পর্যবেক্ষণ অভিযানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রোডম্যাপ হিসেবে কাজ করবে। এই তালিকায় থাকা গ্রহগুলো জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) এবং ২০২৬ বা ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ উৎক্ষেপণের অপেক্ষায় থাকা ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়াও, ২০২৯ সালের মার্চ মাসে চালু হতে যাওয়া এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ (ELT) এই অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করবে। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-এর 'Gaia' মিশন এবং নাসার এক্সোপ্ল্যানেট আর্কাইভ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই বিশেষ তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণা দলটি যখন ত্রিমাত্রিক বাসযোগ্য অঞ্চলের মানদণ্ড ব্যবহার করে আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ চালায়, তখন তালিকাটি সংকুচিত হয়ে ২৪টি গ্রহে নেমে আসে। এই গ্রহগুলো তাদের নক্ষত্র থেকে পৃথিবীর সমতুল্য বিকিরণ গ্রহণ করে। এদের মধ্যে ১০টি গ্রহ এমন নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ঘুরছে যাদের শক্তি বিকিরণ আমাদের সূর্যের প্রায় সমান। এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক এবং সান ফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির স্নাতক জিলিস লোরি জানান যে, যেকোনো বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির সফলতার জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় লক্ষ্যবস্তুগুলো আগেভাগে নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।
বর্তমানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মাধ্যমে দ্রুত গবেষণার জন্য TRAPPIST-1 e এবং TOI-715 b গ্রহ দুটিকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই গ্রহগুলো ছোট লাল বামন নক্ষত্রের চারপাশে আবর্তিত হয়, যা তাদের বায়ুমণ্ডলীয় বৈশিষ্ট্যগুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা সহজ করে তোলে। যদিও লাল বামন নক্ষত্রগুলো প্রায়শই ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি বিকিরণ করে, তবে TRAPPIST-1 e-এর মতো গ্রহগুলো তাদের কক্ষপথের দূরত্বের কারণে স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে। পৃথিবী থেকে মাত্র ৪০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এই নক্ষত্রমণ্ডলগুলো বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে প্রাণের রাসায়নিক চিহ্ন বা বায়োসিগনেচার খোঁজার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
'Probing the Limits of Habitability: A Catalog of Rocky Exoplanets in the Habitable Zone' শিরোনামের এই গবেষণাপত্রটি অধ্যাপক কাল্টেনেগার এবং তার গবেষক দল তৈরি করেছেন। বাসযোগ্য অঞ্চলের প্রান্তে থাকা গ্রহগুলো পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রাণের বিকাশে বাধা দানকারী বিভিন্ন তাপীয় প্রভাব সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন। ইতিমধ্যে JWST টেলিস্কোপ K2-18 b নামক গ্রহের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মিথেন গ্যাস শনাক্ত করে মহাকাশ বিজ্ঞানে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এই ৪৫টি গ্রহের তালিকাটি আগামী এক দশকে সৌরজগতের বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব খোঁজার বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাকে আরও সুসংগঠিত করবে।