সূর্যের তুলনায় প্রায় 1540 গুণ বড় WOH G64 নক্ষত্রটি রঙ পরিবর্তন করেছে এবং একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের আগে ধাপে পৌঁছাতে পারে। তবে পাওয়া টাইটানিয়াম অক্সাইড এই সংস্করণকে সন্দেহের মুখে ফেলেছে।
২০২৬ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে বিশালকায় নক্ষত্র WOH G64-এর বর্তমান অবস্থা এবং এর শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ১,৬৩,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত বড় ম্যাগেলানিক মেঘ (Large Magellanic Cloud) নামক ছায়াপথে এই নক্ষত্রটি অবস্থান করছে, যা মহাকাশ গবেষকদের কাছে এক পরম বিস্ময়। সূর্যের চেয়ে ১,৫৪০ গুণ বড় ব্যাসার্ধ এবং প্রায় ৩০ গুণ বেশি ভরের অধিকারী এই নক্ষত্রটিকে বিজ্ঞানীরা এতদিন 'চরম লাল সুপারজায়ান্ট' বা লাল অতিদানব হিসেবে চিহ্নিত করে আসছিলেন। মাত্র ৫০ লক্ষ বছর বয়সী এই নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতা আমাদের সূর্যের চেয়ে প্রায় ২,৮২,০০০ গুণ বেশি, যা আমাদের ৪৬০ কোটি বছর বয়সী সূর্যের তুলনায় এক বিশাল বিবর্তনমূলক বৈপরীত্য তৈরি করে। এর অতিকায় আয়তনের কারণে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একে 'মনস্টার' বা 'বেহেমথ' (IRAS 04553–6825) নামেও অভিহিত করে থাকেন।
২০১৩ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী সময়ে এই নক্ষত্রটির আচরণে কিছু আকস্মিক এবং নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছিল। সেই সময়কার তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারণা করেছিলেন যে, WOH G64 হয়তো একটি বিরল 'হলুদ হাইপারজায়ান্ট' বা হলুদ অতিদানব পর্যায়ে রূপান্তরিত হচ্ছে। নক্ষত্রের বিবর্তনের এই পর্যায়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাধারণত নক্ষত্রের আসন্ন ধ্বংসের সংকেত দেয়, যা পরবর্তীতে একটি শক্তিশালী সুপারনোভা বিস্ফোরণ অথবা সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরে পতনের ইঙ্গিত হতে পারে। অ্যাথেন্সের ন্যাশনাল অবজারভেটরির ডক্টর গঞ্জালো মুনোজ-সানচেজের নেতৃত্বাধীন একটি বিশেষজ্ঞ দল তখন এই পরিবর্তনের সপক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন এবং জানিয়েছিলেন যে নক্ষত্রটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং এর ব্যাসার্ধ কমে ৮০০ সৌর ব্যাসার্ধে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকান লার্জ টেলিস্কোপ (SALT) থেকে সংগৃহীত নতুন তথ্য এই পূর্ববর্তী মডেলটিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কিলে ইউনিভার্সিটির গবেষক ইয়াকো ভ্যান লুন এবং ইউনিভার্সিদাদ আন্দ্রেস বেলোর বিজ্ঞানী কেইচি ওনাকা তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্বখ্যাত 'Monthly Notices of the Royal Astronomical Society' জার্নালে প্রকাশ করেন। তাদের অত্যন্ত সূক্ষ্ম বর্ণালী বিশ্লেষণে WOH G64-এর বায়ুমণ্ডলে টাইটানিয়াম অক্সাইড (TiO) নামক বিশেষ অণুর অস্তিত্ব ধরা পড়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ হলুদ অতিদানব নক্ষত্রগুলো এতটাই উত্তপ্ত হয় যে সেখানে টাইটানিয়াম অক্সাইডের মতো অণুগুলো স্থিতিশীল অবস্থায় থাকতে পারে না। এই নতুন তথ্যটি নক্ষত্রটির হলুদ অতিদানব হওয়ার সম্ভাবনাকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এবং জোরালোভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে WOH G64 সম্ভবত এখনও একটি লাল সুপারজায়ান্ট হিসেবেই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।
গবেষক ভ্যান লুন এবং ওনাকা তাদের তত্ত্বে আরও উল্লেখ করেছেন যে, ২০২৫ সালে নক্ষত্রটির উজ্জ্বলতা প্রায় দুই ম্যাগনিটিউড কমে যাওয়ার পেছনে এর আসন্ন মৃত্যু নয়, বরং একটি উত্তপ্ত ও অদৃশ্য সঙ্গী নক্ষত্রের (companion star) সাথে এর মিথস্ক্রিয়া দায়ী হতে পারে। এর আগে ২০২৪ সালে চিলিতে অবস্থিত ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ইন্টারফেরোমিটার (VLTI) ব্যবহার করে আকাশগঙ্গার বাইরে অবস্থিত কোনো নক্ষত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তারিত ছবি ধারণ করা হয়েছিল। সেই চিত্রে WOH G64-এর চারপাশে ধূলিকণার একটি বিশাল আবরণ দেখা গিয়েছিল, যা নক্ষত্রটি থেকে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ভর হ্রাসের বিষয়টি নিশ্চিত করে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পরিচালিত 'ASSESS' নামক একটি আন্তর্জাতিক প্রকল্পের মাধ্যমে ডক্টর আলসেস্ট বোনানোস এই ধরনের দানবীয় নক্ষত্রগুলোর অনিয়মিত ভর হ্রাসের প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালিয়েছেন, যেখানে WOH G64 ছিল একটি মূল উদাহরণ।
এই বৈজ্ঞানিক বিতর্কটি মহাকাশের বিশাল ভরের নক্ষত্রগুলোর জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ের চরম জটিলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। নক্ষত্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং বাইনারি বা জোড় নক্ষত্রের পারস্পরিক প্রভাবের কারণে তাদের আচরণ বোঝা কতটা কঠিন, তা বেটেলজিউস নক্ষত্রের ক্ষেত্রেও অতীতে দেখা গিয়েছিল। WOH G64-এর মতো বিশাল নক্ষত্রগুলো তাদের প্রচণ্ড বিকিরণ এবং অত্যন্ত দ্রুত বিবর্তনের কারণে প্রাণের টিকে থাকার জন্য এক প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে এই নক্ষত্রটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বর্তমানে রিয়েল-টাইমে একটি নক্ষত্রের বিবর্তন দেখার এক অনন্য সুযোগ পাচ্ছেন। বর্তমানে এই নক্ষত্রটির ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনটি প্রধান বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা খোলা রয়েছে: একটি প্রলয়ঙ্করী সুপারনোভা বিস্ফোরণ, সরাসরি কৃষ্ণগহ্বরে রূপান্তর, অথবা সঙ্গী নক্ষত্রের প্রভাবে একটি অস্বাভাবিক লাল সুপারজায়ান্ট হিসেবে মহাকাশে টিকে থাকা।