জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি মহাবিশ্বে নথিভুক্ত হওয়া অন্যতম শক্তিশালী মহাজাগতিক বিস্ফোরণের ঘটনাটি যাচাই করেছেন, যা AT2024wpp নামে পরিচিত এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে ‘হুইপেট’ (Whippet) নামে ডাকা হচ্ছে। এই ঘটনাটি আসলে একটি টাইডাল ডিসরাপশন ইভেন্ট (TDE) বা জোয়ারজনিত ধ্বংসের ঘটনা, যা ২০২৪ সালে ঘটেছিল। এই প্রক্রিয়ায় একটি অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বর একটি বিশাল নক্ষত্রকে টুকরো টুকরো করে দেয়, যার ফলে সূর্যের উজ্জ্বলতার প্রায় ৪০০ বিলিয়ন গুণ শক্তির নির্গমন ঘটে। এই সংক্রান্ত বিস্তারিত গবেষণাটি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির মাসিক নোটিসেস জার্নালে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।
জোয়ারজনিত ধ্বংসের ঘটনাটি তখনই ঘটে যখন কোনো নক্ষত্র কোনো অতিবৃহৎ কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছাকাছি চলে আসে এবং একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে প্রবেশ করে। কৃষ্ণগহ্বরের প্রচণ্ড জোয়ারের শক্তি নক্ষত্রটিকে ছিন্নভিন্ন করে দেয় এবং নক্ষত্রের উপাদানগুলি একটি প্রবাহ তৈরি করে যা পরে কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে একটি অ্যাক্রিশন ডিস্ক গঠন করে। ‘হুইপেট’-এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে এর বিশাল শক্তি নির্গমন, যা পূর্বে জানা যেকোনো সুপারনোভা বিস্ফোরণের চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়াও, এই ঘটনায় সৃষ্ট শক ওয়েভ বা অভিঘাত তরঙ্গ আলোর গতির প্রায় ২০ শতাংশ বেগে প্রসারিত হচ্ছিল, যা ঘণ্টায় প্রায় ২১৫ মিলিয়ন কিলোমিটারের সমান। ধারণা করা হচ্ছে, যে নক্ষত্রটি ধ্বংস হয়েছিল তার ভর সূর্যের ভরের প্রায় ৩০ গুণ হতে পারে এবং এটি সম্ভবত একটি উলফ-রায়ে (Wolf-Rayet) শ্রেণির নক্ষত্র ছিল।
এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় লিভারপুল জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্যানিয়েল পার্লি অংশগ্রহণ করেছিলেন। তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়েছিল জি উইকি ট্রানজিয়েন্ট ফ্যাসিলিটি (ZTF), নাসা’র সোয়ফট স্যাটেলাইট এবং ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের লিভারপুল টেলিস্কোপ। জোয়ারজনিত ধ্বংসের ঘটনাগুলি কৃষ্ণগহ্বরের পদার্থবিদ্যা, বিশেষত তাদের বৃদ্ধির প্রক্রিয়া সম্পর্কে অমূল্য তথ্য সরবরাহ করে। গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে নক্ষত্রের উপাদানগুলি এমনভাবে প্রসারিত হয়েছিল যা আক্ষরিক অর্থে ‘নক্ষত্রের স্প্যাগেটি’র মতো কাঠামো তৈরি করেছিল। এর উচ্চ তাপমাত্রা এবং শক্তিশালী এক্স-রে নির্গমনের কারণে ঘটনাটিকে সম্ভবত ‘কাউ-টাইপ ট্রানজিয়েন্ট’ (LFBOT) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা এর প্রোটোটাইপ AT 2018cow থেকে এটিকে আরও ব্যতিক্রমী করে তোলে।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানা হো সহ গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করেছেন যে প্রথম ৪৫ দিনের মধ্যে নির্গত শক্তি একটি সাধারণ সুপারনোভা দ্বারা নির্গত শক্তির চেয়ে ১০০ গুণ বেশি ছিল। হাওয়াইয়ের মাউনা কেয়াতে অবস্থিত কেক টেলিস্কোপ ব্যবহার করে পরবর্তী বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে যে LFBOT গুলি সাধারণ সুপারনোভা দ্বারা নয়, বরং চরম জোয়ারজনিত ধ্বংসের ফলেই শক্তি লাভ করে। এই পর্যবেক্ষণ কৃষ্ণগহ্বরের পদার্থবিদ্যার প্রচলিত মডেলগুলিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বিস্ফোরণের স্থান থেকে ঘণ্টায় ২১ মিলিয়ন কিলোমিটার বেগে সরে যাওয়া হিলিয়াম এবং বিস্ফোরণের ৩৫ দিন পরে বর্ণালীতে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের ক্ষীণ উপস্থিতি বৈজ্ঞানিক রহস্য তৈরি করেছে, যা আরও গভীর অধ্যয়নের দাবি রাখে।
এই ঘটনাটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১.১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এটি কৃষ্ণগহ্বরের অ্যাক্রিশন প্রক্রিয়া অধ্যয়নের এক অনন্য সুযোগ এনে দিয়েছে, কারণ এই কৃষ্ণগহ্বরটি সম্ভবত এই ঘটনার আগে পর্যন্ত ‘সুপ্ত’ অবস্থায় ছিল এবং এই ধ্বংসের মাধ্যমেই প্রথম দৃশ্যমান হলো। এই ধরনের বিরল এবং শক্তিশালী ঘটনা মহাজাগতিক বস্তুগুলির চরম পরিস্থিতিতে আচরণ বোঝার জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
