SETI@Home প্রোগ্রামের উত্সাহীরা ঘরের কম্পিউটার ব্যবহার করে বাইরের সভ্যতা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছে। বিজ্ঞানীরা তাদের আবিষ্কার করা 100টি সংকেতের ওপর ফোকাস করেছেন।
SETI@home প্রকল্পটি নাগরিক বিজ্ঞান এবং ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে একটি আন্তর্জাতিক মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত। এই প্রকল্পটি পুয়ের্তো রিকোর কিংবদন্তি আরেসিবো অবজারভেটরি থেকে সংগৃহীত তথ্যের বিশ্লেষণ পর্ব সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। উল্লেখ্য যে, ২০২০ সালের ডিসেম্বরে কাঠামোগত বিপর্যয়ের কারণে আরেসিবো টেলিস্কোপটি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৯৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মহৎ উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে ২০ লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবক তাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা ভাগ করে নিয়েছিলেন, যা একে ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এবং সফল অংশগ্রহণমূলক বিজ্ঞান প্রকল্পে পরিণত করেছে।
গত দুই দশকে প্রায় ১২ বিলিয়ন সম্ভাব্য মহাজাগতিক সংকেত বিশ্লেষণ করার পর, ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি বার্কলে-র ডেভিড অ্যান্ডারসন এবং এরিক কোরপেলার নেতৃত্বাধীন বিশেষজ্ঞ দলটি ১০০টি অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক রেডিও সংকেত শনাক্ত করেছে। এই সংকেতগুলো এখন আরও গভীর এবং নিবিড় গবেষণার দাবি রাখে। প্রাথমিক ১২ বিলিয়ন ডেটা থেকে ফিল্টারিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ১০ লক্ষ সম্ভাব্য সংকেত বাছাই করা হয়েছিল। এই জটিল প্রক্রিয়ায় 'ডিসক্রিট ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম'-এর মতো উন্নত গাণিতিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ডপলার ইফেক্টসহ বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সি বৈচিত্র্য পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া, পৃথিবীর নিজস্ব রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ইন্টারফারেন্স (RFI) বা কৃত্রিম গোলযোগ দূর করতে ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউটের সুপারকম্পিউটারসহ বিশাল কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
বর্তমানে এই ১০০টি নির্বাচিত সংকেত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী একক-অ্যাপারচার রেডিও টেলিস্কোপ—চীনের 'ফাইভ-হান্ড্রেড-মিটার অ্যাপারচার স্ফেরিক্যাল টেলিস্কোপ' (FAST)-এর মাধ্যমে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাস থেকে FAST এই সংকেতগুলোর পুনরাবৃত্তি এবং বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো কেবল মহাজাগতিক নয়েজ বা বিশৃঙ্খলা নয়। চীনের গুইঝু প্রদেশে অবস্থিত এই টেলিস্কোপটির সংবেদনশীলতা এবং তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা আরেসিবোর চেয়ে অনেক গুণ বেশি। এটি মহাকাশের অনেক গভীর থেকে সংকেত সংগ্রহ করতে সক্ষম, যা ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান প্রাণীর সন্ধানে বিজ্ঞানীদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
১৯৯৯ সালের মে মাসে BOINC প্ল্যাটফর্মে যাত্রা শুরু করা SETI@home প্রকল্পটি এ পর্যন্ত প্রায় ২০ লক্ষ বছরেরও বেশি সম্মিলিত কম্পিউটিং সময় ব্যয় করেছে। প্রকল্পের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অ্যান্ডারসন উল্লেখ করেছেন যে, ভিনগ্রহের প্রাণীর সাথে সরাসরি যোগাযোগ এখনও স্থাপিত না হলেও, এই প্রকল্পের ফলাফল ভবিষ্যতের মহাজাগতিক অনুসন্ধানের জন্য সংবেদনশীলতার নতুন মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে। অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিচালক ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী এরিক কোরপেলা গবেষণার সময় বাদ পড়া তথ্যগুলোর গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে উন্নততর পদ্ধতি এবং সংশোধিত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে পুরো ডেটাসেটটি আবারও নতুন করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
SETI@home এবং FAST-এর এই যৌথ প্রচেষ্টা মূলত ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ থেকে সুনির্দিষ্ট এবং উচ্চ-অগ্রাধিকার সম্পন্ন লক্ষ্যবস্তু যাচাইয়ের দিকে একটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু করার পর থেকেই FAST টেলিস্কোপটি নিজস্বভাবে SETI অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই টেলিস্কোপটির হাজার হাজার এক্সোপ্ল্যানেটে উন্নত সভ্যতার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আরেসিবোর তথ্যের এই চূড়ান্ত বিশ্লেষণ এখন আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মহাজাগতিক 'টেকনোসিগনেচার' বা উন্নত প্রযুক্তির চিহ্ন খোঁজার পথকে আরও সুগম, কার্যকর এবং বিজ্ঞানসম্মত করে তুলেছে।