পৃথিবীর স্পন্দন কি দ্রুততর হচ্ছে? নতুন মাত্রার কম্পন আর কানে রহস্যময় গুঞ্জন কি কোনো বড় পরিবর্তনের সংকেত?

লেখক: Uliana Soloveva

পৃথিবীর স্পন্দন কি দ্রুততর হচ্ছে? নতুন মাত্রার কম্পন আর কানে রহস্যময় গুঞ্জন কি কোনো বড় পরিবর্তনের সংকেত?-1

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর প্রাকৃতিক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কম্পন বা 'শুমান রেজোন্যান্স'-এ এক অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন। একে প্রায়শই "পৃথিবীর হৃদস্পন্দন" বলা হয়, যা মূলত বিশ্বজুড়ে বজ্রপাতের ফলে তৈরি হওয়া নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ। সাধারণত এই কম্পন ৭.৮৩ হার্টজে স্থিতিশীল থাকে, তবে এই মাসে একটি মাঝারি মাত্রার সৌর শিখার (solar flare) কারণে এর তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মহাকাশ আবহাওয়া ট্র্যাকিং অ্যাপ 'MeteoAgent'-এর তথ্যমতে, এই আকস্মিক বৃদ্ধি আয়নোস্ফিয়ারে বিঘ্ন ঘটিয়েছে—বায়ুমণ্ডলের এই স্তরেই সৌর বিকিরণ কণাগুলোকে চার্জ করে দূরপাল্লার রেডিও যোগাযোগ সচল রাখে, যা নাসা (NASA) বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে।

পৃথিবীর কম্পনের একটি তীব্র স্পাইক মস্তিষ্কে এক অদ্ভুত 'গুঞ্জন' ধ্বনি সৃষ্টি করতে পারে (NYP).

শুমান রেজোন্যান্স মূলত পৃথিবীর পৃষ্ঠ এবং আয়নোস্ফিয়ারের মধ্যবর্তী স্থানে তৈরি হয়, যেখানে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৫০টি বজ্রপাত এক ধরণের বিশেষ "গুঞ্জন" বা 'হাম' সৃষ্টি করে। এই ছন্দটি অনেকটা মেট্রোনোমের মতো কাজ করে, যা প্রকৃতিতে ভারসাম্য বজায় রাখে। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সেই সৌর শিখা এই স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত করেছে। মাসের চারটি দিনে ভূ-চৌম্বকীয় বা জিওম্যাগনেটিক কার্যকলাপের মাত্রা ৯-পয়েন্ট স্কেলে ৫-এর উপরে উঠে গিয়েছিল। এই ধরণের পরিবর্তন কেবল স্যাটেলাইট, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা রেডিও সিগন্যালকেই প্রভাবিত করে না, বরং মানুষের মস্তিষ্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে আগ্রহী করে তুলেছে।

অনেক মানুষ এই সময়ে বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, ঝিমুনি ভাব, মানসিক অস্পষ্টতা বা 'ব্রেন ফগ', মেজাজের পরিবর্তন এবং বিশেষ করে কানে এক ধরণের রহস্যময় ভোঁ-ভোঁ শব্দ বা টিনিটাস। ঘুমের সময় বা বিশ্রামের অবস্থায় মানুষের মস্তিষ্ক ৪ থেকে ৮ হার্টজ সীমার মধ্যে থিটা-তরঙ্গ (theta waves) তৈরি করে, যা শুমান ফ্রিকোয়েন্সির খুব কাছাকাছি। পৃথিবীর এই "হৃদস্পন্দন" যদি দ্রুততর হয়, তবে তা মানুষের সার্কাডিয়ান রিদম বা শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে ব্যাহত করতে পারে, যার ফলে অনিদ্রা বা হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। 'MeteoAgent'-এর বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তাত্ত্বিকভাবে এই কম্পন মস্তিষ্কের প্রক্রিয়াগুলোকে কিছুটা ওলটপালট করে দিতে পারে, যা মনোযোগ কমিয়ে দেয় এবং অস্বস্তি সৃষ্টি করে।

এই কম্পন বৃদ্ধির খবর দ্রুত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্ল্যাটফর্ম 'X'-এ (সাবেক টুইটার) নিউ ইয়র্ক পোস্টের একটি পোস্ট হাজার হাজার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই পোস্টে পৃথিবীর কম্পন তরঙ্গ এবং এক মহিলার কান চেপে ধরার ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যবহারকারীরা সেখানে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন: কেউ টিনিটাস বেড়ে যাওয়ার কথা বলেছেন, আবার কেউ বাম কানে এই শব্দ হওয়াকে আধ্যাত্মিক জগতের সংকেত এবং ডান কানে হওয়াকে 'গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল' বা রক্ষাকর্তা ফেরেশতাদের ইতিবাচক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অনেকে একে পৃথিবীর ফ্রিকোয়েন্সি বৃদ্ধির মাধ্যমে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর প্রস্তুতি হিসেবে দেখছেন। এমনকি প্রযুক্তি বা আবহাওয়ার সাথে একে যুক্ত করা সংশয়বাদীরাও এই সম্মিলিত রূপান্তরের বিষয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা এই বিষয়ে আরও গভীরতা যোগ করেছে। জাপানের একটি গবেষণায় নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সির ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক কম্পন এবং রক্তচাপের ওঠানামার মধ্যে একটি যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, আবহাওয়া থেকে শুরু করে শারীরিক গঠন—অন্যান্য অনেক বিষয়ও এখানে ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্যের ওপর শুমান রেজোন্যান্সের সরাসরি প্রভাবের কোনো অকাট্য প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি, তবে এই পরিসংখ্যানগত মিলগুলো ভাববার অবকাশ রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়টি এখনো পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে এবং কঠোর বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হওয়া বাকি।

ফেব্রুয়ারির এই আকস্মিক কম্পন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মহাজাগতিক প্রক্রিয়ার সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবন কতটা নিবিড়ভাবে জড়িত। বিজ্ঞানীরা যখন তাদের পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন বিশ্বজুড়ে মানুষ পৃথিবীর এই "গুঞ্জন" শোনার চেষ্টা করছে এবং ভাবছে এটি তাদের মস্তিষ্কে কোনো প্রতিধ্বনি তুলছে কি না। এই পরিবর্তনটি সম্ভবত একটি বিবর্তনীয় নবায়নের লক্ষণ হতে পারে, যেখানে পৃথিবী নতুন মহাজাগতিক সংকেতের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছে। মানবজাতিও হয়তো সেই পথ অনুসরণ করছে, যা বৃহত্তর সম্প্রীতি এবং সচেতনতার নতুন সম্ভাবনা উন্মোচন করতে পারে।

63 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • New York Post

  • New York Post

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।