উচ্চ সমুদ্র চুক্তির কার্যকর হওয়ার উদযাপন
সীমানাহীন মহাসাগর পেল আইনি কণ্ঠস্বর: কার্যকর হলো ঐতিহাসিক ‘হাই সিস ট্রিটি’ (BBNJ)
লেখক: Inna Horoshkina One
১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিশ্বজুড়ে সমুদ্র সংরক্ষণের ইতিহাসে এক নতুন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সূচিত হয়েছে। এই বিশেষ দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলো জাতিসংঘের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য বিষয়ক একটি বিশেষ চুক্তি, যা আন্তর্জাতিক মহলে BBNJ (Biodiversity Beyond National Jurisdiction) নামে পরিচিত। সাধারণ মানুষের কাছে এবং সংবাদমাধ্যমে এটি ‘হাই সিস ট্রিটি’ বা উন্মুক্ত সমুদ্র চুক্তি হিসেবেই সমধিক পরিচিতি লাভ করেছে। এই চুক্তিটি মূলত আন্তর্জাতিক জলসীমায় প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষার জন্য বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং শক্তিশালী আইনি কাঠামো হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল, যা দীর্ঘদিনের আইনি শূন্যতা পূরণ করবে।
এই যুগান্তকারী আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোটি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, যা সমুদ্রের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এই চুক্তির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
- রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে উন্মুক্ত মহাসাগরে ‘সামুদ্রিক সুরক্ষিত এলাকা’ (Marine Protected Areas) গঠন করার আইনি ক্ষমতা প্রদান।
- উন্মুক্ত সমুদ্রে পরিচালিত যেকোনো বাণিজ্যিক বা বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে ‘পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন’ (Environmental Impact Assessment) রিপোর্ট প্রদান নিশ্চিত করা।
- সামুদ্রিক জেনেটিক সম্পদ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশ্বের সকল দেশের জন্য আরও ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা।
এই চুক্তিটি আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যেখানে অন্তত ৬০টি দেশের অনুসমর্থন বা র্যাটিফিকেশন প্রয়োজন ছিল। সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময় গণনা শুরু হয় এবং অবশেষে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এটি পূর্ণ আইনি শক্তি লাভ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই এই চুক্তিতে অনুসমর্থনকারী দেশের সংখ্যা ৮০ অতিক্রম করে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী পরিবেশ রক্ষার প্রতি দেশগুলোর সম্মিলিত আগ্রহ ও দৃঢ় অঙ্গীকারের বহিঃপ্রকাশ।
মহাসাগরের গুরুত্ব এবং এর বিশালতা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর মোট সমুদ্র এলাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কোনো নির্দিষ্ট দেশের জাতীয় সীমানার মধ্যে পড়ে না। BBNJ চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে এই বিশাল জলরাশি মূলত অগোছালো এবং খণ্ডিত কিছু আন্তর্জাতিক নিয়মের অধীনে পরিচালিত হতো। ফলে কোনো বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় বা সংকটের সময় দ্রুত এবং সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। এখন এই নতুন এবং সুসংহত ব্যবস্থার মাধ্যমে ‘২০৩০ সালের মধ্যে মহাসাগরের অন্তত ৩০ শতাংশ এলাকা রক্ষা’ করার যে বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা (যা ‘30 by 30’ নামে পরিচিত) নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা এখন অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং পদ্ধতিগত হবে।
তবে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, BBNJ চুক্তিটি সমুদ্রের তলদেশে গভীর সমুদ্র খনির (deep-sea mining) মতো অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত সমস্যার সরাসরি সমাধান প্রদান করে না। এই বিষয়টি এখনো ইন্টারন্যাশনাল সিবেড অথরিটির (International Seabed Authority) নির্দিষ্ট এখতিয়ারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাই এই চুক্তিটিকে কোনো ‘জাদুকরী সমাধান’ বা তাৎক্ষণিক নিরাময় হিসেবে না দেখে বরং একটি নতুন আন্তর্জাতিক মঞ্চ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এখানে বিশ্বের দেশগুলো এখন থেকে আরও সুশৃঙ্খল এবং আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে সমুদ্রের সুরক্ষায় তাদের প্রধান ভূমিকাগুলো পালন করতে পারবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই চুক্তির বাস্তবায়ন আমাদের গ্রহের সম্মিলিত সচেতনতা এবং রাজনৈতিক পরিপক্কতারই একটি উজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মহাসাগর এখন আর কোনো ‘মালিকহীন বা পরিত্যক্ত স্থান’ হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং এটি আমাদের সবার একটি অভিন্ন এবং নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে স্বীকৃত হবে। এটি কেবল ‘আমার’ বা ‘তোমার’ ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, বরং এটি আমাদের সবার এক অবিচ্ছেদ্য এবং জীবন্ত দিগন্ত। এই নতুন আইনি কণ্ঠস্বর সমুদ্রের বিশালতাকে কেবল একটি ভৌগোলিক এলাকা হিসেবে নয়, বরং একটি যত্নশীল ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার অধীনে নিয়ে আসবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নিরাপদ পৃথিবী নিশ্চিত করবে।
