WhaleSpotter: সামনে কী আছে তা দেখুন. নীচে যারা বাস করে তাদের রক্ষা করুন.
তিমি রক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে ‘হোয়েলস্পটার’ প্রযুক্তি
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
উডস হোল ওশানোগ্রাফিক ইনস্টিটিউশন (Woods Hole Oceanographic Institution) এর গবেষকদের উদ্ভাবিত ‘হোয়েলস্পটার’ (WhaleSpotter) প্রযুক্তি এখন বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এই অত্যাধুনিক সিস্টেমটি বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করেছে।
এই সিস্টেমে মূলত থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা এবং পেরিফেরাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা হয়েছে। এর প্রধান কাজ হলো জাহাজের আশেপাশে থাকা তিমি বা অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শনাক্ত করা, যাতে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়ানো সম্ভব হয়।
হোয়েলস্পটার প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর নিরবিচ্ছিন্ন কার্যক্ষমতা। এটি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সমানভাবে কাজ করতে পারে। এমনকি ঘন কুয়াশা বা রাতের অন্ধকারেও, যখন সাধারণ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিগুলো ব্যর্থ হয়, তখন এই প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রাণীদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম।
এই সিস্টেমটি জাহাজ থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত সামুদ্রিক প্রাণীদের উপস্থিতি টের পেতে পারে। এর ফলে জাহাজের নাবিকরা গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের নিবিড় গবেষণার ফসল হলো এই প্রযুক্তি। বর্তমানে বিশ্বের ৫০টিরও বেশি স্থানে প্রায় ১০০টি হোয়েলস্পটার সিস্টেম সক্রিয় রয়েছে, যা ইতিমধ্যে ২,৫০,০০০-এর বেশি সামুদ্রিক প্রাণীর সফল শনাক্তকরণ নিশ্চিত করেছে।
এই প্রযুক্তির প্রসারে ২০২৩ সালে ম্যাটসন নেভিগেশন কোম্পানি (Matson Navigation Company) ১ মিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল অনুদান প্রদান করে। এই আর্থিক সহায়তা প্রযুক্তিটিকে আরও উন্নত ও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করে তুলেছে।
বর্তমানে টাকোমা (Tacoma), আলাস্কা (Alaska) এবং হাওয়াই (Hawaii) এর মধ্যবর্তী সমুদ্রপথগুলোতে এই সিস্টেমটি নিয়মিত ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে সামুদ্রিক প্রাণীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
হোয়েলস্পটার সিস্টেমটি মূলত কয়েকটি প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাজ করে:
- টেলিডাইন এফএলআইআর (Teledyne FLIR) কোম্পানির তৈরি ‘বোসন প্লাস’ (Boson+) থার্মাল ক্যামেরা
- উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগরিদম
- বিশেষজ্ঞ জীববিজ্ঞানীদের মাধ্যমে শনাক্তকরণ যাচাইকরণ
এই সিস্টেমের অ্যালগরিদম এতটাই উন্নত যে এটি সমুদ্রের ঢেউ বা পাখির ডানা ঝাপটানোর মতো ভুল তাপীয় সংকেতগুলোকে সহজেই আলাদা করতে পারে। প্রতিটি সম্ভাব্য শনাক্তকরণ মাত্র ১৫ থেকে ৩৪ সেকেন্ডের মধ্যে বিশেষজ্ঞরা যাচাই করেন এবং দ্রুত জাহাজের ক্যাপ্টেনকে সতর্কবার্তা পাঠান।
বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এই সিস্টেমের কার্যকারিতা প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছে। এটি আধুনিক প্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন যা পরিবেশ রক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখছে এবং সামুদ্রিক যাতায়াতকে নিরাপদ করছে।
এই প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো উত্তর আটলান্টিক রাইট হোয়েল (North Atlantic right whale)-এর মতো বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোকে রক্ষা করা। বর্তমানে বিশ্বে এই প্রজাতির মাত্র ৩৮০টি তিমি অবশিষ্ট রয়েছে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন।
জাহাজের সাথে সংঘর্ষ এই প্রাণীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (National Oceanic and Atmospheric Administration) কর্তৃক নির্ধারিত জাহাজের গতিসীমা ঝুঁকি কমালেও, হোয়েলস্পটারের মতো আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী সিস্টেম এই দুর্ঘটনাগুলো পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে।
হোয়েলস্পটার প্রযুক্তি প্রমাণ করে যে কীভাবে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং থার্মাল ইমেজিংয়ের মতো সরঞ্জামগুলো বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করতে পারে। এটি সমুদ্রের অতল গভীরে লুকিয়ে থাকা জীবনকে মানুষের চোখের সামনে নিয়ে আসে।
পরিশেষে, এই প্রযুক্তি কেবল যান্ত্রিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি মানুষ এবং সমুদ্রের বিশালকায় প্রাণীদের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন তৈরি করে। এর মাধ্যমে আমরা হয়তো সমুদ্রের সেই বিশাল প্রাণীদের ভাষা বুঝতে শিখব এবং তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আরও যত্নশীল হব।
উৎসসমূহ
Ocean News & Technology
Somerville Today
ECO Magazine
EIN Presswire
WhaleSpotter
PR Newswire

