অ্যান্টার্কটিকার গভীরে প্রাণের নতুন স্পন্দন: হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের রহস্য উন্মোচন

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

অ্যান্টার্কটিকা কথায় প্রকাশিত নয় — আমাদের তৃতীয় অ্যান্টার্কটিকা অভিযান

দক্ষিণ মহাসাগরের এক দুর্গম ও রহস্যময় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত South Shetland Trench-এ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এক অভাবনীয় বাস্তুসংস্থানের সন্ধান পেয়েছেন। এই নতুন আবিষ্কৃত প্রাণজগতটি সম্পূর্ণভাবে Chemosynthesis বা রাসায়নিক সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে, যা বিজ্ঞানীদের পূর্ববর্তী অনেক ধারণাকেই বদলে দিয়েছে।

সমুদ্রের এই গভীরতম অংশে সূর্যের আলো পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব, ফলে সেখানে চিরকাল বিরাজ করে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এমন এক প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণের অস্তিত্ব থাকাটা এক সময় অকল্পনীয় ছিল, কিন্তু প্রকৃতির বিস্ময়কর ক্ষমতা আবারও প্রমাণিত হয়েছে এই আবিষ্কারের মাধ্যমে।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি সম্ভব হয়েছে Triton X deep sea autonomous vehicle নামক একটি অত্যাধুনিক গভীর সমুদ্রগামী স্বয়ংক্রিয় যানের মাধ্যমে। এই যানটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অপটিক্যাল সেন্সর দ্বারা সজ্জিত, যা পানির সূক্ষ্ম রাসায়নিক পরিবর্তন বা গ্রেডিয়েন্টগুলো নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম।

গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা সেখানে বেশ কিছু চমকপ্রদ বিষয় লক্ষ্য করেছেন যা এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে:

  • ঘন এবং বিস্তৃত মাইক্রোবিয়াল ম্যাট বা অণুজীবের আস্তরণ
  • গভীর সমুদ্রের বিচিত্র ও বিরল প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণীদের বসতি
  • সক্রিয় Hydrothermal vent বা হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের চারপাশের প্রাণবন্ত অঞ্চল

পৃথিবীর পরিচিত বাস্তুসংস্থানগুলোতে সাধারণত Photosynthesis বা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সূর্য থেকে শক্তি আসে। তবে এই অন্ধকার জগতে প্রাণের মূল চালিকাশক্তি হলো পৃথিবীর অভ্যন্তরের রাসায়নিক শক্তি, যা এক অনন্য জৈবিক ভারসাম্য তৈরি করেছে।

এখানে অণুজীবগুলো হাইড্রোজেন সালফাইডের মতো রাসায়নিক যৌগের জারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব পদার্থ তৈরি করে। এই প্রক্রিয়াই মূলত পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং প্রতিকূল পরিবেশে জীবনের চাকা সচল রাখে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি ভূগর্ভস্থ জৈব-রাসায়নিক কারখানার সাথে তুলনা করা যেতে পারে যেখানে নিরন্তর উৎপাদন চলছে। পৃথিবীর ভূত্বক থেকে উত্তপ্ত তরল ফাটল দিয়ে ওপরে উঠে আসে, যার মধ্যে থাকে বিভিন্ন বিজারিত রাসায়নিক যৌগ।

ব্যাকটেরিয়াগুলো এই যৌগগুলোকে জারিত করে শর্করা এবং প্রয়োজনীয় জৈব অণু তৈরি করে। পরবর্তীতে এই ব্যাকটেরিয়াগুলোই অন্যান্য প্রাণীদের সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় অথবা তাদের সাথে মিথোজীবী অংশীদার হিসেবে বসবাস করে জীবন ধারণ করে।

উল্লেখ্য যে, এই ধরণের বাস্তুসংস্থান প্রথমবার আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের এক ঐতিহাসিক অভিযানের সময় Galápagos Rift অঞ্চলে। সেই আবিষ্কারটি জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল এবং বর্তমান আবিষ্কারটি সেই গবেষণাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেল।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা সংগৃহীত জেনেটিক নমুনাগুলো নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করছেন যাতে নতুন প্রজাতিগুলো সঠিকভাবে শনাক্ত করা যায়। তাদের মূল লক্ষ্য হলো এই প্রাণীদের বিপাকীয় পথ এবং চরম প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশলগুলো গভীরভাবে বোঝা।

এই গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করবে যে, মহাসাগরের তাপমাত্রার পরিবর্তন কীভাবে অ্যান্টার্কটিকার গভীর সমুদ্রের প্রজাতিগুলোর বিস্তারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এই ধরণের আবিষ্কারগুলো আমাদের গ্রহ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর জীবমণ্ডল সূর্যের আলো ছাড়াও বিশাল চাপ এবং গ্রহের নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, এর অর্থ হলো জীবন এমন সব জায়গায় সৃষ্টি হতে এবং টিকে থাকতে পারে যেখানে আমরা আগে কখনো কল্পনাও করিনি। সমুদ্রের অতল গহ্বরে সূর্যের আলো না থাকলেও সেখানে রয়েছে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ তাপ, রসায়ন এবং বিবর্তনের এক মহাকাব্য।

প্রতিটি হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের গ্রহের প্রাণ কেবল সূর্যের আলোতেই স্পন্দিত হয় না। কখনও কখনও জীবনের হৃদস্পন্দন পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরেও সমানভাবে অনুরণিত হয় এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক একটি নতুন পৃথিবী।

2 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • BBC

  • People

  • The New Daily

  • The Times of India

  • MyJoyOnline

  • Geo News

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।