উত্তর সাগরে বিশাল গ্রহাণু আঘাত: 160m মেটিয়র বিস্ফোরণ কিভাবে 330-ফুট সুনামি তৈরি করেছে
সিলভারপিট ক্রেটারের রহস্য উন্মোচন: উত্তর সাগরের তলদেশে প্রাচীন গ্রহাণুর আঘাত
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
উত্তর সাগরের তলদেশে অবস্থিত রহস্যময় সিলভারপিট ক্রেটার (Silverpit Crater) যে আসলে একটি গ্রহাণুর আঘাতের ফলেই সৃষ্টি হয়েছিল, তার চূড়ান্ত নিশ্চিতকরণ করা হয়েছে ২০২৬ সালের ১১ মার্চ। নতুন একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশের মাধ্যমে এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, সিলভারপিট হলো একটি প্রাচীন ইমপ্যাক্ট ক্রেটার, যা কোটি কোটি বছর আগে মহাজাগতিক সংঘর্ষের ফলে গঠিত হয়েছিল।
এই বিশেষ কাঠামোটি ইয়র্কশায়ার উপকূল থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ২০০২ সালে উত্তর সাগরের দক্ষিণ সেডিমেন্টেশন বেসিনে গ্যাস অনুসন্ধানের সময় সংগৃহীত সিসমিক তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি প্রথম আবিষ্কৃত হয়। সেই সময়েই ভূতাত্ত্বিকরা এর বৃত্তাকার আকৃতি, কেন্দ্রীয় চূড়া এবং ঘনীভূত চ্যুতি ব্যবস্থার মতো বৈশিষ্ট্যগুলো লক্ষ্য করেছিলেন, যা একটি সম্ভাব্য মহাজাগতিক আঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
দীর্ঘদিন ধরে এই ক্রেটারের উৎপত্তি নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিতর্ক ছিল। অনেকে মনে করতেন এটি লবণের স্তরের নড়াচড়া বা আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তার কারণে সমুদ্রতলের ধসের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা এই সব বিকল্প ব্যাখ্যাকে নাকচ করে দিয়েছে এবং মহাজাগতিক সংঘর্ষের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
হেরিওট-ওয়াট ইউনিভার্সিটির (Heriot-Watt University) গবেষক উইসডিয়ান নিকোলসনের (Uisdean Nicholson) নেতৃত্বে এবং ন্যাচারাল এনভায়রনমেন্ট রিসার্চ কাউন্সিলের (Natural Environment Research Council) সহায়তায় একটি বিশেষজ্ঞ দল এই রহস্য সমাধানে কাজ করেছে। তারা উচ্চ-নির্ভুল সিসমিক স্ক্যানিং এবং শিলা নমুনার মাইক্রোস্কোপিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
তেলকূপ থেকে সংগৃহীত শিলাখণ্ড বা কোর নমুনাগুলো এই গবেষণায় চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করেছে। এই নমুনাগুলোতে 'শকড কোয়ার্টজ' এবং বিকৃত 'ফেল্ডস্পার' পাওয়া গেছে। এই খনিজগুলো কেবলমাত্র মহাজাগতিক আঘাতের ফলে সৃষ্ট প্রচণ্ড চাপের মাধ্যমেই তৈরি হতে পারে এবং সাধারণ কোনো ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় এদের উৎপত্তি হওয়া অসম্ভব।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের (Imperial College London) গ্যারেথ কলিন্সের (Gareth Collins) পরিচালিত গাণিতিক মডেলিং এই গবেষণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। তার সিমুলেশন বা মডেলিং স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, সিলভারপিটের গঠন কাঠামোটি একটি গ্রহাণুর আঘাতের পরিস্থিতির সাথে হুবহু মিলে যায়।
নতুন প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই মহাজাগতিক ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে প্রায় ৪৩ থেকে ৪৬ মিলিয়ন বছর আগে, যা ভূতাত্ত্বিক সময়ের হিসেবে মধ্য-ইওসিন (Eocene) যুগ। এই সময়কাল নির্ধারণের ফলে পৃথিবীর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে যা দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল।
বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী সেই ঘটনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:
- গ্রহাণুটির ব্যাস ছিল প্রায় ১৬০ মিটার
- সংঘর্ষের সময় এর গতিবেগ ছিল প্রতি সেকেন্ডে ১৫ কিলোমিটারের বেশি
- এর ফলে সৃষ্ট ক্রেটারটির ব্যাস ছিল প্রায় ৩.২ কিলোমিটার
সংঘর্ষের মুহূর্তটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এর ফলে শিলা এবং সমুদ্রের জল প্রচণ্ড বেগে উপরের দিকে ছিটকে ওঠে, যা প্রায় ১.৫ কিলোমিটার উচ্চতার একটি বিশাল স্তম্ভ তৈরি করেছিল। এই বিশাল আলোড়ন সমুদ্রের বুকে এক প্রলয়ঙ্কারী সুনামির সৃষ্টি করেছিল যা চারপাশের উপকূলে আছড়ে পড়েছিল।
গবেষকদের মতে, সেই সুনামির উচ্চতা ১০০ মিটারেরও বেশি হতে পারত। এই বিশাল ঢেউ তৎকালীন উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ভৌগোলিক পরিবর্তন এনেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। আজ সেই ধ্বংসলীলার চিহ্ন সমুদ্রের গভীরে কয়েকশ মিটার নিচে চাপা পড়ে আছে।
বর্তমানে সিলভারপিট ক্রেটারটি আধুনিক সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে প্রায় ৭০০ মিটার গভীরে সমাহিত অবস্থায় রয়েছে। এর চারপাশে প্রায় ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি বৃত্তাকার চ্যুতি বা ফাটল ব্যবস্থা বিস্তৃত রয়েছে, যা এর বিশালত্বের এবং আঘাতের তীব্রতার প্রমাণ দেয়।
সমুদ্রের তলদেশে পলিমাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার কারণে এই ক্রেটারটি আশ্চর্যজনকভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। এটি এখন পৃথিবীর বিরল পানির নিচের ইমপ্যাক্ট স্ট্রাকচারগুলোর তালিকায় স্থান করে নিয়েছে, যার মধ্যে মেক্সিকোর বিখ্যাত চিক্সুলুব ক্রেটার (Chicxulub Crater) অন্যতম প্রধান হিসেবে পরিচিত।
সিলভারপিট ক্রেটারের এই নিশ্চিতকরণ কেবল একটি দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক বিতর্কের অবসান ঘটায় না, বরং এটি পৃথিবীর ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে। প্রতিটি গ্রহাণু পৃথিবীতে কেবল ধ্বংসই বয়ে আনে না, বরং সাথে করে নিয়ে আসে মহাজাগতিক বিভিন্ন উপাদান।
গ্রহাণুগুলো বিরল খনিজ, আইসোটোপ এবং কখনও কখনও জৈব অণু বহন করে আনে, যা আদি পৃথিবীতে প্রাণের রসায়ন গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। এখন সিলভারপিটের উৎপত্তি নিশ্চিত হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এটিকে আরও গভীরভাবে অধ্যয়ন করার সুযোগ পাবেন এবং এর প্রতিটি স্তর বিশ্লেষণ করবেন।
সমুদ্রের তলদেশের পলিস্তরের নিচে চার কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে জমে থাকা এই শিলাগুলোতে মহাজাগতিক ঘটনার এক অনন্য আর্কাইভ বা নথিপত্র লুকিয়ে থাকতে পারে। গবেষকরা যত গভীরে অনুসন্ধান চালাবেন, ততই পৃথিবীর সাথে মহাকাশের আদি সম্পর্কের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সমুদ্রের তলদেশের এই নিস্তব্ধতায় হয়তো লুকিয়ে আছে সেই সব প্রশ্নের উত্তর—গ্রহাণুগুলো পৃথিবীতে ঠিক কী নিয়ে এসেছিল এবং জীবনের বিবর্তনের ইতিহাসে তারা কী ভূমিকা পালন করেছিল। মহাসাগরগুলো কেবল জল আর প্রাণের আধার নয়, এগুলো পৃথিবীর মহাজাগতিক স্মৃতির এক বিশাল ভাণ্ডার।
সম্ভবত সেখানেই, সমুদ্রতলের অতল গভীরে, আমাদের গ্রহের সাথে মহাকাশের প্রাচীন মিলনের গল্পগুলো পাথরের স্তরে স্তরে খোদাই করা আছে। সমুদ্র কেবল পৃথিবীর ইতিহাস নয়, বরং মহাবিশ্বের সাথে আমাদের সম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল হিসেবে টিকে আছে।
উৎসসমূহ
ScienceDaily
ScienceDaily
Wikipedia
Space.com
SSBCrack News
Heriot-Watt University


