আলকাট্রাজেস দ্বীপে বেগোনিয়া লারোরামের পুনরাবিষ্কার: এক শতাব্দীর দীর্ঘ অনুপস্থিতির অবসান

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

ব্রাজিলের সাও পাওলো রাজ্যের উপকূলীয় অঞ্চলে এক অনন্য উদ্ভিদ প্রজাতি 'Begonia larorum'-এর পুনরাবির্ভাবের খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রজাতিটি মূলত আলকাট্রাজেস দ্বীপপুঞ্জের একটি স্থানীয় বা এন্ডেমিক উদ্ভিদ। ১৯২০-এর দশকে জার্মান প্রাণিবিজ্ঞানী হারমান লুডারওয়াল্ড শেষবার এই উদ্ভিদটি সংগ্রহ করেছিলেন, যার পর থেকে দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০২২ সালে সাও পাওলো স্টেট রিসার্চ সাপোর্ট ফাউন্ডেশন (Fapesp)-এর আর্থিক সহায়তায় দ্বীপের উদ্ভিদকুলের তালিকা হালনাগাদ করার একটি বিশেষ প্রকল্প শুরু হয়, যার অংশ হিসেবে গবেষক দলগুলো সেখানে নিয়মিত অনুসন্ধান চালিয়ে আসছিলেন।

এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সাফল্যের দেখা মেলে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সেপ্টেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত পরিচালিত মোট ১৪টি অভিযানের একটিতে দ্বীপের ঝোপঝাড়ের নিচে এই উদ্ভিদের একটি মাত্র নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়। তবে প্রাথমিক অবস্থায় পাওয়া সেই নমুনাটি প্রজননক্ষম ছিল না। উদ্ভিদটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য ঐতিহাসিক বর্ণনার সাথে নিবিড়ভাবে মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিজ্ঞানীরা পুনরায় সেখানে অভিযানে গেলে ১৯টি উদ্ভিদের একটি ছোট কিন্তু স্থিতিশীল জনবসতি খুঁজে পান, যার মধ্যে ১৭টি উদ্ভিদই ছিল প্রজনন পর্যায়ে।

ক্যাম্পিনাস বিশ্ববিদ্যালয়ের (Unicamp) পিএইচডি শিক্ষার্থী গ্যাব্রিয়েল সাবিনো এবং অধ্যাপক ফাবিও পিনহেইরো সহ একদল বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানী এখন এই উদ্ভিদের ল্যাবরেটরি ক্লোনিং বা কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মূল বাসস্থানের বাইরে বা 'ex situ' সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রজাতিটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা। গবেষকদের বিশ্বাস, এই প্রজাতিটি যে স্থানে পাওয়া গেছে তার চরম বিচ্ছিন্নতা এবং দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানই একে এতদিন মানুষের অগোচরে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।

আলকাট্রাজেস দ্বীপটি ২০১৬ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলীয় নৌবাহিনী তাদের কামানের গোলার অনুশীলনের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করত। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই সামরিক কর্মকাণ্ডের ফলে সেখানে বেশ কয়েকবার বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই আগুন এবং মানুষের হস্তক্ষেপের কারণেই বেগোনিয়া প্রজাতিটি দ্বীপের আরও দুর্গম এবং নিরাপদ এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, মূল ভূখণ্ডের অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় Begonia larorum পানির অভাব সহ্য করতে অনেক বেশি সক্ষম। এর শিকড়গুলো বেশ মজবুত এবং এটি মূলত পাথুরে জমিতে জন্মানোর (rupicolous) অভ্যাস গড়ে তুলেছে, সেই সাথে এর পাতাগুলোও বেশ মসৃণ প্রকৃতির।

এই গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ফলাফল ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে 'Oryx The International Journal of Conservation' নামক আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। অত্যন্ত সীমিত বিচরণ এলাকা এবং উদ্ভিদের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য হওয়ার কারণে বিজ্ঞানীরা এই প্রজাতিটিকে আইইউসিএন (IUCN) রেড লিস্ট অনুযায়ী 'মারাত্মকভাবে বিপন্ন' (Critically Endangered) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জোর সুপারিশ করেছেন। মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই আলকাট্রাজেস দ্বীপপুঞ্জ বর্তমানে আইসিএমবিআইও (ICMBio)-এর অধীনে আলকাট্রাজেস ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজ এবং টুপিনাম্বাস ইকোলজিক্যাল স্টেশনের অংশ হিসেবে কঠোরভাবে সংরক্ষিত।

এক শতাব্দী ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর Begonia larorum-এর এই পুনরাবিষ্কার পরিবেশের সেই বিশেষ ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বকে পুনরায় সামনে এনেছে, যা এই প্রজাতিটিকে প্রতিকূলতার মাঝেও টিকিয়ে রেখেছে। বিজ্ঞানীদের পরবর্তী লক্ষ্য হলো এই উদ্ভিদের জিনতত্ত্ব, পরাগায়ন প্রক্রিয়া এবং এর অনন্য অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করা। এর মাধ্যমে তারা এই দুর্লভ উদ্ভিদের বাস্তুসংস্থান এবং বিবর্তনীয় ইতিহাস সম্পর্কে আরও গভীর ও স্বচ্ছ জ্ঞান অর্জনের আশা প্রকাশ করছেন।

9 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • nsctotal.com.br

  • Xataka Brasil

  • Xataka Brasil

  • NSC Total

  • NSC Total

  • Gazeta de São Paulo

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।