পূর্ব অ্যান্টার্কটিক বরফের চাদরে ৬৯°০০'৫০'' দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ৩৯°৩৬'২২'' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের কাছে একটি অদ্ভুত আয়তাকার কাঠামো লক্ষ্য করা গেছে, যা ইন্টারনেটে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই জ্যামিতিক গঠনটি দেখে অনেকেই এর উৎস সম্পর্কে নানা জল্পনা-কল্পনা শুরু করেছিলেন। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিজ্ঞানীরা এই রহস্যের একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, যেখানে তারা কোনো ধরনের কৃত্রিম হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছেন। এই অনন্য প্রাকৃতিক দৃশ্যটি অ্যান্টার্কটিকার কঠোর পরিবেশে কীভাবে জ্যামিতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছিল।

নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক বেথান ডেভিস, যিনি হিমবাহের গতিপ্রকৃতি পুনর্গঠনে একজন বিশেষজ্ঞ, এই প্রাকৃতিক ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি AntarcticGlaciers.org-এর একজন প্রধান বিশেষজ্ঞ এবং যুক্তরাজ্যের অ্যান্টার্কটিক প্লেস-নাম কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যাপক ডেভিসের মতে, এই অদ্ভুত আকৃতিটি আসলে তলদেশে আটকে পড়া কোনো আইসবার্গ অথবা বরফের স্তর পাতলা হয়ে যাওয়ার ফলে বেরিয়ে আসা কোনো পাথুরে শৈলশিরা হতে পারে। তার গবেষণা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহের প্রতিক্রিয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপর গুরুত্বারোপ করে, যা বর্তমান বিশ্বের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন যে, বরফের প্রবাহ যখন মাটির নিচের কোনো বাধার সংস্পর্শে আসে, তখন এই ধরনের জটিল ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি হয়। শক্তিশালী কাতাব্যাটিক বায়ু এবং বরফ গলার বিশেষ ধরণ এই গঠনটিকে একটি সুনির্দিষ্ট জ্যামিতিক রূপ দিয়েছে। অ্যান্টার্কটিকার এই কাতাব্যাটিক বায়ু অত্যন্ত শীতল এবং ঘন হওয়ার কারণে অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে মালভূমি থেকে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে এই বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ২০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। যেহেতু হিমবাহটি বাতাসকে ক্রমাগত শীতল রাখে, তাই এই বাতাসের কোনো নির্দিষ্ট দৈনিক পর্যায়ক্রম নেই এবং এটি অবিরাম প্রবাহিত হতে থাকে।
অ্যান্টার্কটিক বরফের চাদর মহাদেশটির প্রায় ৯৮ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি বিশ্বের বৃহত্তম বরফের আধার। এর মোট আয়তন প্রায় ১৪ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এবং বরফের পরিমাণ ২৬.৫ মিলিয়ন ঘন কিলোমিটার, যা গলে গেলে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ৫৮ মিটার বৃদ্ধি পেতে পারে। শোয়া স্টেশনটি যেখানে অবস্থিত, সেই পূর্ব অ্যান্টার্কটিক চাদরটি একটি বিশাল বরফের মালভূমি, যার গড় উচ্চতা প্রায় ৩ কিলোমিটার এবং বরফের পুরুত্ব প্রায় ২.৫ কিলোমিটার। এখান থেকেই শক্তিশালী কাতাব্যাটিক বায়ু উৎপন্ন হয়ে মূল ভূখণ্ডের কেন্দ্র থেকে শীতল বাতাস বয়ে নিয়ে আসে।
হিমবাহবিদ্যায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০২৪ সালে রিচার্ডসন পদক বিজয়ী অধ্যাপক ডেভিস উপগ্রহ চিত্র এবং ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য ব্যবহার করে হিমবাহের অতীত ও বর্তমান আচরণ বিশ্লেষণ করেন। এই আয়তাকার গঠনের ক্ষেত্রে তার পদ্ধতিটি ব্যাখ্যা করে যে, কীভাবে অভিকর্ষ এবং ভূ-প্রকৃতির প্রভাবে চলমান বরফের স্রোত কোনো উপ-হিমবাহীয় বাধাকে পাশ কাটিয়ে বা ক্ষয় করে একটি কৃত্রিম আকৃতির বিভ্রম তৈরি করতে পারে। অ্যান্টার্কটিকায় এই ধরনের বাতাস কখনো কখনো ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে প্রবাহিত হতে পারে, যা বরফের উপরিভাগে শক্তিশালী ক্ষয়কার্য এবং ভাস্কর্য তৈরির মতো কাজ করতে সক্ষম।
পরিশেষে বলা যায়, ইন্টারনেটে আলোচিত এই আয়তাকার আকৃতিটি আসলে প্রকৃতির মৌলিক ভৌত প্রক্রিয়ার একটি চমৎকার উদাহরণ। বরফের অভিকর্ষজ প্রবাহ, নিচের শিলাস্তরের সাথে মিথস্ক্রিয়া এবং কাতাব্যাটিক বায়ুর মতো চরম আবহাওয়াগত পরিস্থিতি পৃথিবীতে এমন সব কাঠামো তৈরি করতে পারে যা প্রথম দর্শনে অস্বাভাবিক বা কৃত্রিম মনে হয়। এই ঘটনাটি হিমবাহ ব্যবস্থার জটিলতা এবং গতিশীলতাকে পুনরায় প্রমাণ করে, যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শক্তির প্রভাবে প্রতিনিয়ত পুনর্গঠিত হচ্ছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির নিজস্ব কারুকার্য মানুষের তৈরি যেকোনো স্থাপত্যের চেয়েও বিস্ময়কর হতে পারে।

