বরফ ভাঙন জাহাজ "Laura Bassi" Ross Sea-এ চার মাস থাকার পরে Antarctica-কে নিয়ে তার 41তম গ্রীষ্মকালীন অভিযান সম্পন্ন করেছে।
ইতালীয় বরফভাঙা জাহাজ "লরা বাসি" (Laura Bassi) তার ৪১তম গ্রীষ্মকালীন অ্যান্টার্কটিক অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন করে ২০২৬ সালের ৬ মার্চ নিউজিল্যান্ডের লিটেলটন বন্দরে ফিরে এসেছে। চার মাসব্যাপী এই দীর্ঘ এবং চ্যালেঞ্জিং মিশনটি মূলত রস সাগরের প্রতিকূল সামুদ্রিক পরিবেশে পরিচালিত হয়েছিল। ন্যাশনাল অ্যান্টার্কটিক রিসার্চ প্রোগ্রাম (PNRA) দ্বারা অর্থায়িত এই অভিযানটি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের রহস্য উন্মোচনে এবং মেরু অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য বুঝতে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই বিশেষ অভিযানে ৪৪ জন কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি ২৩ জন দক্ষ ক্রু সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন। গবেষণার মূল কর্মসূচিতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার মধ্যে দুটি প্রকল্প বৈশ্বিক জলবায়ু প্রক্রিয়া বিশ্লেষণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে "MYSTERO" নামক প্রকল্পটি রস সাগরের মহীসোপানে অবস্থিত ডুবো পাহাড় বা উচ্চভূমিগুলো নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত ছিল। সমান্তরালভাবে পরিচালিত "CSICLIC" প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ মহাসাগরের তলদেশের পলিতে কার্বন ডাই অক্সাইড বিনিময়ের একটি বিস্তারিত এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ প্রদান করা। উল্লেখ্য যে, দক্ষিণ মহাসাগর বিশ্ব মহাসাগরীয় অঞ্চলের শোষিত মোট কার্বন ডাই অক্সাইডের প্রায় ৪০ শতাংশ গ্রহণ করে, যা পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অন্যতম প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে।
"লরা বাসি" জাহাজটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ওশেনোগ্রাফি অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড জিওফিজিক্স (OGS) দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এটি বর্তমানে ইতালীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন একমাত্র সমুদ্রবিজ্ঞান গবেষণা জাহাজ। পোলার কোড অনুযায়ী এই জাহাজটি পিসি৫ (PC5) শ্রেণীর বরফভাঙা জাহাজ হিসেবে প্রত্যয়িত, যা এর অত্যন্ত শক্তিশালী কাঠামোর প্রমাণ দেয়। ৮০ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজের পণ্য ধারণক্ষমতা ৪০২৮ টন, যা মেরু অঞ্চলের জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী মিশনগুলোর জন্য একে একটি অপরিহার্য বৈজ্ঞানিক সরঞ্জামে পরিণত করেছে। এর উন্নত প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বিজ্ঞানীদের প্রতিকূল বরফাবৃত অঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা চালিয়ে যেতে সাহায্য করে।
৪১তম এই অভিযানের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যরাশি দক্ষিণ মহাসাগরের কার্বন চক্রের জটিল ভূমিকা বুঝতে বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে সাহায্য করবে। বিশেষ করে CSICLIC প্রকল্পের মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের পলি বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদী কার্বন সঞ্চয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানা সম্ভব হবে, যা শত শত এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে চলতে পারে। বর্তমান বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে এই তথ্যগুলো অত্যন্ত জরুরি, কারণ মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের ফলে উৎপন্ন অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি এবং কার্বনের ২৫ শতাংশ মহাসাগরগুলো শোষণ করে নিয়েছে। এই নতুন তথ্যগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মডেলগুলোকে আরও নিখুঁত এবং কার্যকর করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
"লরা বাসি" জাহাজটি ইতিপূর্বেও তার সাহসী অভিযানের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছে এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে PNRA-এর ৩৮তম অভিযানের সময় এই জাহাজটি তিমির উপসাগরের (Bay of Whales) ৭৮° ৪৪.২৮০' দক্ষিণ অক্ষাংশে পৌঁছেছিল, যা কোনো জাহাজের মাধ্যমে সমুদ্রপথে অর্জিত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দক্ষিণতম বিন্দুতে পৌঁছানোর এক অনন্য রেকর্ড। ৪১তম এই মিশনের সফল সমাপ্তি এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ অ্যান্টার্কটিকায় ইতালীয় বৈজ্ঞানিক উপস্থিতির কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে আবারও বিশ্বমঞ্চে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এই ধরনের ধারাবাহিক গবেষণা মেরু অঞ্চলের ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ জলবায়ু সুরক্ষায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করছে।