বিজ্ঞানীরা আন্তার্কটিকার বরফের নিচে প্রায় 2400 মিটার গভীরতায় IceCube নিউট্রিন অবজার্ভেটরিতে সেন্সর স্থাপন সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন।
দক্ষিণ মেরুর আমুন্ডসেন-স্কট স্টেশনে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি তাদের পরিকাঠামোর একটি বিশাল মাপের আধুনিকায়ন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল কম শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা। ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া তিনটি পৃথক মাঠ পর্যায়ের অভিযানের পর, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ১.৬ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরতায় বরফ খনন বা ড্রিলিং করার মাধ্যমে এই কাজ চূড়ান্ত করা হয়। এই আধুনিকায়নের ফলে ৬০০টিরও বেশি নতুন এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল অপটিক্যাল সেন্সর মডিউল স্থাপন করা হয়েছে, যা ছয়টি নতুন ক্যাবলের মাধ্যমে বিন্যস্ত। এর ফলে অ্যান্টার্কটিক বরফের এক ঘনকিলোমিটার এলাকার মধ্যে মোট ক্যাবলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২টিতে, যা মহাজাগতিক কণা পর্যবেক্ষণে এক নতুন মাইলফলক।
আন্টার্কটিকার IceCube নিউট্রিনো অবজারভেটরির এবং 프ান্স-র আইফেল টাওয়ারের স্কেলগুলোর তুলনা।
সেন্সরগুলোর এই বর্ধিত ঘনত্ব নিউট্রিনো অসিলেশন বা দোলনের প্রতি সংবেদনশীলতা বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর মাধ্যমে আইসকিউব দীর্ঘ দূরত্বের বায়ুমণ্ডলীয় নিউট্রিনো পরিমাপের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষণাগার হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করল। নতুন মডিউলগুলোর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক মাল্টি-পিএমটি ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল (mDOM) এবং ডি-এগ (D-Egg), যা আগের প্রজন্মের সেন্সরগুলোর তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি সংবেদনশীল। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ গবেষকদের গত ১৫ বছরের জমানো তথ্য পুনরায় নতুন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করার সুযোগ দেবে। এর ফলে নিউট্রিনো ফ্লেভার এবং মহাজাগতিক রশ্মির গঠন সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন (NSF)-এর মতে, এই আধুনিকায়ন পরিকল্পিত 'আইসকিউব-জেন২' (IceCube-Gen2) সম্প্রসারণের আগে নিউট্রিনো পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব নিশ্চিত করেছে।
নিউট্রিনো গবেষণার সমান্তরালে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর সহযোগিতায় দক্ষিণ মেরুতে দুটি নতুন সিসমোমিটার স্থাপন করা হয়েছে। এই যন্ত্রগুলো এখন পর্যন্ত বিশ্বের গভীরতম স্থানে স্থাপিত সিসমোমিটার হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দক্ষিণ মেরুর বিশাল বরফের চাদরের নিচে প্রায় ৮০০০ ফুট (প্রায় ২.৫ কিলোমিটার) গভীরতায় এই সেন্সরগুলো বসানো হয়েছে। এই গভীর ও অত্যন্ত নিস্তব্ধ পরিবেশ ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ এবং পৃথিবীর গভীর স্তরের গঠন সম্পর্কে অভূতপূর্ব স্বচ্ছতার সাথে গবেষণা করা সম্ভব হবে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই যন্ত্রগুলোর সফল স্থাপন USGS-এর গ্লোবাল সিসমোগ্রাফিক নেটওয়ার্ককে আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করেছে। এই প্রকল্পটি ইউনিভার্সিটি অফ উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সাথে একটি বিশেষ অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।
চরম ঠান্ডা এবং প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি এই সিসমোমিটারগুলো প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৮৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত চাপ সহ্য করতে সক্ষম। এই যন্ত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়াতে এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। এর মধ্যে সুনামির আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষার ওপর নজরদারি করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আইসকিউবের ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তু অনুসন্ধানের পরীক্ষার জন্য আগে তৈরি করা বিশেষ মজবুত কাঠামো ব্যবহার করে এই সিসমিক যন্ত্রগুলো স্থাপন করা হয়েছে। এই সফল উদ্যোগ দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী ভূ-তাত্ত্বিক ও ভূ-পদার্থগত পর্যবেক্ষণের ভিত্তি অনেক বেশি মজবুত করেছে।
আইসকিউব অবজারভেটরির এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে প্রায় সাত বছর সময় লেগেছে, যার মধ্যে নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমান এই কাজ মূলত ভবিষ্যৎ 'আইসকিউব-জেন২' প্রকল্পের একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। আইসকিউব-জেন২ বর্তমান অবজারভেটরির একটি বিশাল সম্প্রসারণ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে তিনটি প্রধান অংশ থাকবে: একটি বর্ধিত অপটিক্যাল অ্যারে, অতি-উচ্চ শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার জন্য একটি বিশাল রেডিও অ্যারে এবং একটি পৃষ্ঠতল বা সারফেস অ্যারে। এই ভবিষ্যৎ স্থাপনাটি TeV থেকে EeV শক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী কণাগুলোর উৎস সম্পর্কে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে এবং পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সীমাবদ্ধতাগুলো পরীক্ষা করতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। বর্তমান এই আপগ্রেডটি GeV রেঞ্জে সংবেদনশীলতা বাড়িয়ে পরবর্তী প্রজন্মের ডিটেক্টর আসার আগ পর্যন্ত গবেষণার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে।