বিড়ালের ঘরঘর শব্দ বা 'পুরিং' তাদের অনন্য কণ্ঠস্বরের পরিচয়: নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, গৃহপালিত বিড়ালের ঘরঘর শব্দ বা 'পুরিং' (purring) তাদের একটি স্থায়ী কণ্ঠস্বরের ছাপ বা 'ভোকাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট' হিসেবে কাজ করে। বিড়ালের মিউ মিউ শব্দের মধ্যে সময়ের সাথে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলেও, তাদের এই বিশেষ ঘরঘর শব্দ অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং অপরিবর্তনীয়। 'সায়েন্টিফিক রিপোর্টস' (Scientific Reports) নামক প্রখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণার ফলাফলগুলো মানুষের কণ্ঠস্বর শনাক্তকরণ পদ্ধতিতে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক কম্পিউটেশনাল টুলস বা গাণিতিক সরঞ্জামের মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছে। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গবেষকরা বিড়ালের কণ্ঠস্বরের এমন কিছু সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য খুঁজে পেয়েছেন যা আগে কখনো ধরা পড়েনি।

বার্লিনের মিউজিয়াম ফর ন্যাচারকুন্ডে (Museum für Naturkunde Berlin) এবং নেপলস ফেদেরিকো দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Naples Federico II) বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দল এই বিস্তারিত অনুসন্ধানটি পরিচালনা করেন। তারা গৃহপালিত বিড়াল এবং বিভিন্ন বন্য বিড়ালের কণ্ঠস্বরের একটি গভীর শাব্দিক বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছেন। এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, বিড়ালের ঘরঘর শব্দ একটি ধ্রুবক এবং নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সি সম্পন্ন ছন্দময় প্যাটার্ন বজায় রাখে। এই স্থিতিশীলতা প্রতিটি বিড়ালকে আলাদাভাবে শনাক্ত করার জন্য একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য শাব্দিক মার্কার হিসেবে কাজ করে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, একটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের এই ঘরঘর শব্দের কম্পাঙ্ক সাধারণত ২৫ থেকে ১৫০ হার্টজ (Hertz) সীমার মধ্যে অবস্থান করে।

গবেষণার একটি আকর্ষণীয় দিক হলো বিড়ালের 'মিউ' (meow) ডাকের সাথে এর তুলনা। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে বিড়ালের মিউ ডাক অত্যন্ত নমনীয় এবং এটি প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। বিড়াল যখন ক্ষুধার্ত থাকে, যখন তার মনোযোগের প্রয়োজন হয় অথবা যখন সে কোনো মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার মিউ ডাকের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হয়। গবেষকদের মতে, মানুষের সাথে হাজার হাজার বছরের সহাবস্থানের ফলে বিড়ালের মধ্যে এই কণ্ঠস্বরের নমনীয়তা বা প্লাস্টিসিটি তৈরি হয়েছে। এটি মূলত মানুষের সাথে যোগাযোগের একটি অভিযোজিত কৌশল। চিতা এবং আফ্রিকান বন্য বিড়ালসহ পাঁচটি ভিন্ন প্রজাতির বন্য বিড়ালের কণ্ঠস্বরের সাথে তুলনা করে দেখা গেছে যে, গৃহপালিত বিড়ালের মিউ ডাকার বৈচিত্র্য ও পরিসর অনেক বেশি বিস্তৃত।

এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক দানিলো রুসো (Danilo Russo) এবং প্রখ্যাত বায়োঅ্যাকোস্টিক বিশেষজ্ঞ মিরিয়াম নের্নশিল্ড (Mirjam Knörnschild) মানুষের স্বয়ংক্রিয় কথা শনাক্তকরণে ব্যবহৃত বিশেষ পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি বিড়ালের কণ্ঠস্বর কতটা নির্ভুলভাবে আলাদা করা যায় তা যাচাই করা। গবেষণার আরেক সহ-লেখক আনিয়া শিল্ড (Anja Schild) বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তাদের সংগৃহীত নমুনার প্রতিটি বিড়ালেরই একটি নিজস্ব এবং অনন্য ঘরঘর শব্দ ছিল। সাধারণত বিড়ালের এই শব্দটিকে আরাম, প্রশান্তি এবং নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, এটি আসলে প্রাণীর একটি স্থায়ী এবং সহজাত পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে, মিউ শব্দটিকে মানুষের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের একটি কৌশলগত আলোচনার মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা আশা করছেন যে, বিড়ালের ঘরঘর শব্দের এই সূক্ষ্ম শাব্দিক পরিবর্তনগুলো নিয়ে আরও গভীর অধ্যয়ন ভবিষ্যতে পশুচিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এর মাধ্যমে কোনো প্রাণীর মানসিক চাপের মাত্রা বা তার শারীরিক অবস্থার অবনতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে, যা দ্রুত রোগ নির্ণয়ে সহায়ক হবে। পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, গৃহপালিত হওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়া বিড়ালদের মানুষের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেক বেশি 'কথোপকথনপ্রিয়' বা বাচাল করে তুলেছে। তবে এই বিবর্তনীয় পরিবর্তনের মধ্যেও তারা তাদের আদিম এবং রক্ষণশীল নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সি সংকেত বা ঘরঘর শব্দটিকে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি অনন্য ও নির্ভরযোগ্য পরিচয় হিসেবে অত্যন্ত যত্ন সহকারে টিকিয়ে রেখেছে।

7 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • R7 Notícias

  • SciTechDaily

  • ScienceDaily

  • ScienceDaily

  • RealClearScience

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।