সামুদ্রিক স্লাগ Costasiella kuroshimae: ক্লোরোপ্লাস্ট আত্মসাতের মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণ
সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova
সামুদ্রিক জগৎ ক্রমাগত বিস্ময়কর জৈবিক আবিষ্কারের উৎস, যেখানে এমন জীব পাওয়া যায় যাদের বৈশিষ্ট্য উদ্ভিদের সঙ্গে তুলনীয়। *Costasiella kuroshimae* নামক ক্ষুদ্র সামুদ্রিক স্লাগ, যা 'পাতার ভেড়া' নামে পরিচিত, এই উদ্ভিজ্জ বৈশিষ্ট্যের এক অসাধারণ উদাহরণ। এই প্রাণীটি 'ক্লেপ্টোপ্লাস্টি' নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সালোকসংশ্লেষণের এক বিশেষ রূপ প্রদর্শন করতে সক্ষম। এই প্রক্রিয়াটি প্রাণীজগতের সাধারণ খাদ্য গ্রহণের পদ্ধতির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যা জীববিজ্ঞানের 'প্রাণী' ও 'উদ্ভিদ'-এর সীমানা অস্পষ্ট করে তোলে।
এই অনন্য জীবনধারণের কৌশলটি নির্দিষ্ট সামুদ্রিক শৈবাল ভক্ষণের সঙ্গে জড়িত। স্লাগটি যখন শৈবাল খায়, তখন এটি সম্পূর্ণ হজম না করে শৈবালের ক্লোরোপ্লাস্ট—অর্থাৎ উদ্ভিদের শক্তি-সংগ্রহকারী অঙ্গাণু—আলাদা করে নেয়। এই ক্লোরোপ্লাস্টগুলি স্লাগের নিজস্ব দেহকলায় স্থানান্তরিত হয় এবং সূর্যের আলো ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে। এই প্রক্রিয়াটি কেবল স্লাগের পুষ্টির পরিপূরকই নয়, বরং এটি যে শৈবালের মধ্যে বাস করে, সেখানে এটিকে উজ্জ্বল সবুজ রঙের ছদ্মবেশও প্রদান করে। এই ধরনের অঙ্গাণু আত্মসাৎ করার ক্ষমতাকে 'ক্লেপ্টোপ্লাস্টি' বলা হয়, যার মূল শব্দটি গ্রীক শব্দ 'ক্লেপটেস' (চোর) থেকে এসেছে।
*Costasiella kuroshimae* প্রজাতিটি প্রথম ১৯৯৩ সালে জাপানের কুরোশিমা দ্বীপের কাছে শনাক্ত করা হয়। এই খোলসহীন মেরুদণ্ডী প্রাণীটি স্যাকোগ্লস্যান (Sacoglossan) সামুদ্রিক স্লাগের একটি প্রজাতি এবং এটি কস্টাসিয়েলিডি (Costasiellidae) পরিবারের অন্তর্গত। এদের আকার সাধারণত ৫ থেকে ১০ মিলিমিটারের মধ্যে থাকে, যা এদের অত্যন্ত ক্ষুদ্র করে তোলে। এদের দেহের পাতার মতো কাঠামোকে 'সেরাটা' (cerata) বলা হয়, যা শ্বাস-প্রশ্বাসেও সহায়তা করে এবং এদেরকে ভেড়ার পশমের মতো দেখায়। এদের মাথায় দুটি কালো চোখ এবং দুটি রাইনোফোর (rhinophore) থাকে, যা ভেড়ার কানের মতো দেখায় এবং রাসায়নিক সংকেত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
এই ক্ষুদ্র জীবগুলি সাধারণত জাপান, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়ার উপকূলীয় উষ্ণ ও উপক্রান্তীয় অগভীর সামুদ্রিক জলে পাওয়া যায়। এরা প্রায়শই প্রবাল প্রাচীরের কাছাকাছি বাস করে এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে শৈবালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। *C. kuroshimae* বিশেষভাবে *Avrainvillea* গণের শৈবাল ভক্ষণ করে, যা থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট সংগ্রহ করে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, এই স্লাগগুলি খাদ্য ছাড়াই প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে, যা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত শক্তির গুরুত্ব নির্দেশ করে। যদিও এই প্রক্রিয়াটি পুষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস, তবে ক্লোরোপ্লাস্টগুলি দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকার কারণে কিছু ক্ষেত্রে পুষ্টি সঞ্চয় বা 'ল্যাডার' (larder) হিসেবেও কাজ করতে পারে।
অন্যান্য সালোকসংশ্লেষী সামুদ্রিক স্লাগ, যেমন *Elysia chlorotica*-এর তুলনায়, *C. kuroshimae*-এর জেনেটিক প্রক্রিয়াগুলি এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি, এবং শৈবাল ও স্লাগের মধ্যে জিন স্থানান্তরের কোনো দৃঢ় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে, স্লাগের দেহের অভ্যন্তরে ক্লোরোপ্লাস্টগুলির সক্রিয় থাকার এই ক্ষমতা বিজ্ঞানীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে চলেছে। এই ধরনের জৈবিক উদ্ভাবন বিবর্তনীয় সৃজনশীলতার এক চমৎকার উদাহরণ এবং এটি সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের গভীর রহস্যের দিকে ইঙ্গিত করে, যা ভবিষ্যতে আরও বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের পথ প্রশস্ত করে।
8 দৃশ্য
উৎসসমূহ
unian
Britannica
Science Alert
Discover Wildlife
Forbes
World Wildlife Fund
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
