জৈবপ্রযুক্তি এবং বার্ধক্য গবেষণার ক্ষেত্রে চলমান অগ্রগতি বিবেচনা করে জেনেটিসিস্ট স্টিভ হোরভ্যাথ পূর্বাভাস দিয়েছেন যে মানবজাতির গড় আয়ু শীঘ্রই ১৫০ বছরে পৌঁছাতে পারে। এই উচ্চাভিলাষী অনুমানটি বার্ধক্যকে একটি একক রোগ হিসেবে চিকিৎসা করার পরিবর্তে এর অন্তর্নিহিত জৈবিক প্রক্রিয়াগুলি বোঝার ওপর নির্ভর করে।
স্টিভ হোরভ্যাথ, যিনি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (UCLA)-এর প্রাক্তন অধ্যাপক ছিলেন, তিনি ডিএনএ মিথাইলেশন নামক রাসায়নিক পরিবর্তনের ভিত্তিতে এপিজেনেটিক 'এজিং ক্লক' বা জৈবিক বয়স পরিমাপের পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য পরিচিত। এই ঘড়িগুলি কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গগুলির প্রকৃত বয়স পরিমাপের জন্য বিজ্ঞানীদের একটি অপরিহার্য সরঞ্জাম সরবরাহ করে, যা পূর্বে কেবল কালানুক্রমিক বয়সের ওপর নির্ভরশীল ছিল। হোরভ্যাথ কর্তৃক উদ্ভাবিত পরিমাপকগুলির মধ্যে 'গ্রিমএজ' (GrimAge) মডেল অন্যতম, যা বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভুল মৃত্যু-ঝুঁকি পূর্বাভাসক হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রিমএজ ঘড়িটি কেবল কালানুক্রমিক বয়স নয়, ধূমপানের মতো পরিবেশগত কারণগুলিকেও অন্তর্ভুক্ত করে, যা এটিকে অসুস্থতা ও মৃত্যুর পূর্বাভাসে অন্যান্য এপিজেনেটিক ঘড়িগুলির তুলনায় অধিক কার্যকর করে তুলেছে।
বর্তমানে, স্টিভ হোরভ্যাথ বায়োটেক সংস্থা অল্টোস ল্যাবস (Altos Labs)-এর ইউকে গবেষণা বিভাগের প্রধান গবেষক হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই সংস্থাটি কোষের পুনরুজ্জীবন বা সেলুলার রিপপ্রোগ্রামিং-এর মাধ্যমে বয়স-সম্পর্কিত অবনতি বিপরীত করার জন্য থেরাপি তৈরির ওপর মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে। জেফ বেজোস এবং ইউরি মিলনারের মতো ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগপ্রাপ্ত অল্টোস ল্যাবস কোষের জীবনীশক্তি পুনরুদ্ধার করে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করছে। হোরভ্যাথের লক্ষ্য হলো সরাসরি বার্ধক্যের কারণে সৃষ্ট ক্ষতি মোকাবিলা করে মানব জীবনের 'কাঁচের মৃত্যুহারের তল' (glass mortality floors) অতিক্রম করা। তবে, এই দীর্ঘায়ু অর্জনের জন্য বৈশ্বিক বিপর্যয়, যেমন মহামারী বা পারমাণবিক যুদ্ধ এড়িয়ে চলা অপরিহার্য বলে তিনি জোর দিয়েছেন।
যদিও কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে মানুষের গড় আয়ু ১৫০ বছরে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন, কারণ ১৯৪০ সালের পর থেকে ১০০ বছর অতিক্রমকারী মানুষের মৃত্যুহারের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি, তবুও বর্তমান বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি অতীতের অনেক ভবিষ্যদ্বাণীকে অতিক্রম করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯০০ সালে বিশ্বব্যাপী গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩২ বছর, যা ২০২১ সালের মধ্যে বেড়ে ৭১ বছরে পৌঁছেছে, যার প্রধান কারণ ছিল শিশু মৃত্যুর হার হ্রাস এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতি। গবেষকরা মনে করেন যে জীবনযাত্রার মান, পুষ্টি, পরিচ্ছন্ন জল এবং ভ্যাকসিনের মতো বিষয়গুলির উন্নতি এই নাটকীয় পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। অন্যদিকে, স্ট্যানফোর্ডের গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে দীর্ঘ জীবন মানুষের কাজ ও অবসর গ্রহণের ধারণাকে নতুন করে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে, যেখানে কর্মজীবন আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এপিজেনেটিক ঘড়িগুলি, যা ডিএনএ-তে মিথাইল গ্রুপের সংযোজন বা অপসারণের প্যাটার্ন পরিমাপ করে, তা এখন শতবর্ষী ব্যক্তিদের বয়স যাচাই করতে এবং হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে শক্তিশালী মেশিন লার্নিং সরঞ্জাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। হোরভ্যাথের মতে, সুসংগত জৈবচিকিৎসা উদ্ভাবনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য, যদিও অসীম নয়, জীবনকাল বৃদ্ধি বাস্তবসম্মত। এই বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টাগুলি মানব কোষকে পুনরুজ্জীবিত করার চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘায়ু সংক্রান্ত নৈতিক প্রশ্নগুলিকেও সামনে আনছে, যা ভবিষ্যতের চিকিৎসায় এর প্রয়োগের পথ প্রশস্ত করবে।




