ইউরোপীয় ইউনিয়ন কর্তৃক আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার প্রতিবাদে ইরানের কঠোর পাল্টা ব্যবস্থা

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কর্তৃক ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। ওই দিনই ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তেহরানে নিযুক্ত ইইউভুক্ত দেশগুলোর সকল রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবং একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র তাদের হাতে তুলে দেয়। মূলত ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইরানে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে আইআরজিসি-র ভূমিকার অজুহাতে ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন, এটি ছিল তারই একটি সরাসরি কূটনৈতিক জবাব।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রদূতদের তলব করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং একে ইরানের পক্ষ থেকে একটি 'ন্যূনতম প্রতিক্রিয়া' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ব্রাসেলসের এই সিদ্ধান্তকে "অবৈধ, ভিত্তিহীন এবং চরম ভুল" হিসেবে অভিহিত করে তিনি ইইউ-র বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর ধারাবাহিকতায় ১ ফেব্রুয়ারি ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ ঘোষণা করেন যে, ২০১৯ সালের 'পাল্টা ব্যবস্থা' আইনের অধীনে ইরান এখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সকল দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচনা করবে। আইআরজিসি-র সাবেক এই কমান্ডার সতর্ক করে বলেন যে, এই হঠকারী সিদ্ধান্তের সমস্ত পরিণতির দায়ভার ইউরোপীয় ইউনিয়নকেই বহন করতে হবে।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাদেফুল ইরানের এই পাল্টা পদক্ষেপকে "ভিত্তিহীন" এবং "প্রোপাগান্ডা" বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন যে, বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে আইআরজিসি-র সহিংস আচরণ এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডের কারণে ইইউ-র এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সময়ের দাবি ছিল। উল্লেখ্য যে, এর আগে ২০১৯ সালের এপ্রিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০২৪ সালের জুনে কানাডা আইআরজিসি-কে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ২৯ জানুয়ারি ইইউ-র সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করার সময় ইউরোপীয় কূটনীতির প্রধান কায়া কালাস দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন যে, জনগণের ওপর দমন-পীড়নের ঘটনাগুলো কোনোভাবেই বিনা জবাবে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

এই কূটনৈতিক উত্তেজনা এমন এক সময়ে চরম আকার ধারণ করেছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ফলে আঞ্চলিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন দক্ষিণ চীন সাগর থেকে তার গতিপথ পরিবর্তন করে এবং আনুমানিক ২৬-২৭ জানুয়ারির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) দায়িত্বাধীন এলাকায় অবস্থান গ্রহণ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে এই বিশাল সামরিক উপস্থিতিকে একটি "ম্যাসিভ আর্মাডা" বা বিশাল নৌবহর হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যা এই অঞ্চলে উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করলেও পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক আলোচনার পথগুলো এখনও সচল রাখার চেষ্টা চলছে। তুরস্ক, মিশর এবং কাতার বর্তমানে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানি কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করার জন্য কাজ করছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকটি চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো আলোচনার প্রাথমিক শর্ত হতে হবে তাদের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। অন্যদিকে, ইরানের রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহল পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সংক্রান্ত মার্কিন দাবিগুলো মানতে নারাজ।

ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বর্তমানে বেশ কঠোর। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে যে, জানুয়ারির বিক্ষোভের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে উপহাস করার অভিযোগে একজন টেলিভিশন উপস্থাপকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) ৩১ জানুয়ারি ২০২৬-এর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া বিক্ষোভে এ পর্যন্ত ৬,৭১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যেই আইআরজিসি হরমুজ প্রণালীতে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। যদিও মার্কিন সেন্টকম এই ধরনের কর্মকাণ্ডকে উস্কানিমূলক হিসেবে অভিহিত করে সতর্কবার্তা জারি করেছে, তবুও ইরান তার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Herald Journal

  • Laredo Morning Times

  • The Guardian

  • USNI News

  • The Straits Times

  • The Soufan Center

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।