ইরানে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিষয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের জরুরি অধিবেশন আহ্বান

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর ক্রমবর্ধমান এবং উদ্বেগজনক সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ একটি জরুরি অধিবেশন ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশজুড়ে শুরু হওয়া ব্যাপক গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আইসল্যান্ড, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের মতো প্রভাবশালী সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জোরালো সমর্থনে এই আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মূলত বিক্ষোভ দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে গুরুতর এবং পদ্ধতিগত অভিযোগগুলো সামনে এসেছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করাই এই বিশেষ অধিবেশনের মূল লক্ষ্য। এই উদ্যোগটি বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের ঘটনাবলীতে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ইরান সরকারের পক্ষ থেকে কিছু দাপ্তরিক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একজন ইরানি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, অন্তত ৫,০০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রায় ৫০০ সদস্য রয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই তথ্যের সাথে প্রবল দ্বিমত পোষণ করছে। তাদের মতে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে প্রকৃত তথ্য পাওয়া এবং তা যাচাই করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ (HRANA) ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩,০৯০ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিতভাবে যাচাই করেছে। একই সময়ে আটককৃত ব্যক্তির সংখ্যা ২৪,০০০ ছাড়িয়ে গেছে বলে তারা তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য সানডে টাইমস' দেশটির অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে যে, নিহতের সংখ্যা ১৬,৫০০ থেকে ১৮,০০০ এর মধ্যে হতে পারে এবং ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত আহতের সংখ্যা প্রায় ৩,৩০,০০০ এ পৌঁছেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ফোল্কার তুর্ক এই সহিংসতা এবং শিশুসহ অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরান সরকারকে অবিলম্বে সব ধরনের দমনমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জোরালো আহ্বান জানান। তুর্ক স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগের অজুহাত হিসেবে তাদের 'সন্ত্রাসী' হিসেবে আখ্যায়িত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, সহিংসতার এই ধ্বংসাত্মক চক্র অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতিটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তার মতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো জাতিসংঘের অধীনে একটি স্বাধীন তদন্ত শুরুর জন্য জোরালো লবিং চালিয়ে যাচ্ছে। তারা লক্ষ্য করেছেন যে, ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারির পর থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা দেশজুড়ে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের সাথে মিলে যায়। এই সংস্থাগুলো ২০২২ সালে গঠিত জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের ক্ষমতা আরও বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে যাতে তারা বর্তমান পরিস্থিতির সঠিক তদন্ত করতে পারে। তবে তেহরানের পক্ষ থেকে গণহত্যার সব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে এবং দাবি করা হয়েছে যে, সশস্ত্র উস্কানির প্রেক্ষিতেই নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। এদিকে, ১৫ জানুয়ারি নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব মার্থা পোবি আটককৃতদের ওপর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন।

ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন নিবিড়ভাবে তাকিয়ে আছে জাতিসংঘের এই বিশেষ অধিবেশনের ফলাফলের দিকে, যেখানে মানবাধিকার রক্ষার জন্য কার্যকর এবং বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে দেশব্যাপী ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তথ্য প্রবাহ রোধ করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে, যা তথ্যের স্বচ্ছতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই মানবিক সংকট নিরসনে এবং সাধারণ মানুষের জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বনেতাদের ঐক্যবদ্ধ ও জোরালো প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

2 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Devdiscourse

  • Wikipedia

  • UN News

  • The Sunday Times

  • Reuters

  • Human Rights Watch

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।