বিশাল শীতকালীন ঝড় 'ফার্ন'-এর কবলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: ২২০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, বিদ্যুৎহীন ১ লক্ষ ৭৩ হাজার পরিবার
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশাল অংশ বর্তমানে 'ফার্ন' নামক এক অনানুষ্ঠানিক শীতকালীন ঝড়ের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই প্রলয়ঙ্করী আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে দেশটির অবকাঠামো এবং পরিবহন ব্যবস্থায় নজিরবিহীন অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিউ মেক্সিকো থেকে মেইন পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ২,০০০ মাইলেরও বেশি এলাকা জুড়ে এই ঝড় তাণ্ডব চালাচ্ছে। এর ফলে প্রায় ২২০ মিলিয়ন আমেরিকান নাগরিক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় গত ২২ জানুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার থেকে ফেডারেল পর্যায়ে সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতা শুরু হলেও, ঝড়ের মূল আঘাতটি আসে শনিবার, ২৪ জানুয়ারি।
এই ঝড়ের প্রভাবে তাপমাত্রার পারদ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে। উত্তর সমভূমি বা নর্দার্ন প্লেইনস অঞ্চলে বাতাসের শীতলতা বা উইন্ড চিল মাইনাস ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে, যা জনজীবনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। লুইজিয়ানা এবং টেক্সাসের মতো দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে ভারী তুষারপাতের পাশাপাশি বরফ বৃষ্টি বা লেডিয়ান বৃষ্টির কারণে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১ লক্ষ ৭৩,০০০-এরও বেশি পরিবার বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। এর মধ্যে লুইজিয়ানায় ৭০,০০০-এর বেশি এবং টেক্সাসে প্রায় ৫০,০০০ গ্রাহক অন্ধকারের মধ্যে রয়েছেন। নিউ মেক্সিকোর ওটেরো কাউন্টি ইলেকট্রিক কোঅপারেটিভের মতো পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা জীবন রক্ষার্থে সাময়িকভাবে মেরামতের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
পরিবহন খাতে এই ঝড়ের প্রভাব ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। শনিবার এবং রবিবার মিলিয়ে দেশজুড়ে প্রায় ১৪,৫০০-এরও বেশি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বাতিল করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় বিমান পরিবহন বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। মার্কিন পরিবহন সচিব শন ডাফি আগেই সতর্কবার্তা জারি করে বলেছিলেন যে, এই ঝড়ের প্রভাবে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনোভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য ফেডারেল সহায়তা অনুমোদন করেছেন। ইতিমধ্যে কলম্বিয়া জেলাসহ অন্তত ২১টি অঙ্গরাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে যাতে দ্রুত ত্রাণ ও উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
চরম এই আবহাওয়া কেবল অবকাঠামোর ক্ষতিই করেনি, বরং কেড়ে নিয়েছে মানুষের প্রাণও। নিউ ইয়র্ক শহরে শনিবার আবহাওয়া জনিত কারণে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোচুল নাগরিকদের উদ্দেশ্যে এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাইরে অবস্থান করা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। অন্যদিকে, নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি জানিয়েছেন যে, শহরে ইতিমধ্যে ২০ থেকে ২৩ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে।
ফেডারেল ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি (FEMA) পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আগেভাগেই তাদের ন্যাশনাল রেসপন্স কোঅর্ডিনেশন সেন্টার সক্রিয় করেছে। পাশাপাশি, যোগাযোগ ব্যবস্থার অবকাঠামোগত তথ্য সংগ্রহের জন্য ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (FCC) তাদের দুর্যোগকালীন রিপোর্টিং সিস্টেম চালু করেছে। আরকানসাসের লিটল রকে তুষারপাতের পরিমাণ ১৮৯৯ সালের পর থেকে সমস্ত দৈনিক রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক মাত্রার শীতকালীন ঝড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় অবকাঠামো এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
40 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Daily Mail Online
The Guardian
Forbes
CNA
CNN
NOAA
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
