মধ্যপ্রাচ্যে চরম উত্তেজনা: খারাগ দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলা, কার্যত অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যে নতুন সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল, তা ১৪ মার্চ এক চরম উত্তেজনাকর পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের বিরুদ্ধে একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং শক্তিশালী সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই বিমান হামলায় ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ খারাগ দ্বীপের ৯০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা সম্পূর্ণভাবে অকেজো করে দেওয়া হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল সামরিক সক্ষমতা খর্ব করা, তাই দ্বীপটির তেল উত্তোলন এবং রপ্তানি সংক্রান্ত অবকাঠামোগুলোকে সচেতনভাবে লক্ষ্যবস্তুর বাইরে রাখা হয়েছে এবং সেগুলো বর্তমানে অক্ষত রয়েছে।

এই সামরিক পদক্ষেপটি মূলত তেহরানের অব্যাহত উস্কানির একটি কঠোর জবাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান বর্তমানে প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পুত্র মোজতবা খামেনির নতুন নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, প্রাথমিক হামলার সময় মোজতবা খামেনি আহত হয়েছিলেন, তবে ইরান এই তথ্য গোপন রাখার চেষ্টা করছে। তেহরান বর্তমানে সামরিক চাপের মুখে নিজেদের অভ্যন্তরীণ জনমতকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যাপক প্রচারণামূলক এবং অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল ব্যবহার করছে। বিবিসি ভেরিফাই-এর বিশিষ্ট সাংবাদিক শায়ান সরদারিজাদেহ লক্ষ্য করেছেন যে, মোজতবা খামেনির বেশ কিছু কারসাজি করা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই ছবিগুলোতে গুগল সিনথআইডি (Google SynthID) ওয়াটারমার্কের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে যে তেহরান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নিজেদের অনুকূলে একটি আখ্যান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে।

এই উত্তেজনার সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর, যা বিশ্বের মোট দৈনিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের ট্রানজিট রুট। বর্তমানে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা বিশ্ববাজারে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে যেখানে ১২২৯টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করেছিল, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র ৭৭টি জাহাজ চলাচল করতে সক্ষম হয়েছে। এই নজিরবিহীন অচলাবস্থার ফলে তেলের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। তেল মজুত রাখার জন্য ব্যবহৃত ভিএলসিসি (VLCC) সুপারট্যাঙ্কারগুলোর দৈনিক ভাড়ার হার আকাশচুম্বী হয়ে ৫,০০,০০০ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দশ গুণ বেশি। মাইন্ড মানি-র বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষক ইগর ইসায়েভ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন যে, এই পূর্ণাঙ্গ অবরোধ যদি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক তেল সংকটের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে।

মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে। তারা ইরাকের বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের হেলিকপ্টার অবতরণ কেন্দ্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহতে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা পরিচালনা করেছে। এদিকে লেবাননেও মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েলের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত ২৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসা সেবার ওপর হামলা চালাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১১ মার্চ পর্যন্ত লেবাননের চিকিৎসা পরিষেবার ওপর মোট ২৫টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক এবং সামরিক অঙ্গনে এই সংকটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীন, ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাজ্যকে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে তাদের যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর জরুরি আহ্বান জানিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত ২৫০০ নৌসেনা এবং একটি শক্তিশালী উভচর জাহাজ ওই অঞ্চলে মোতায়েন করছে। অন্যদিকে, ইরান একটি নতুন ভূ-রাজনৈতিক চাল চালছে; তারা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, কেবল চীনা ইউয়ানে তেলের দাম পরিশোধের শর্তে তারা জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে পারে। এটি মূলত বৈশ্বিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের আধিপত্য কমানোর বা ডি-ডলারাইজেশনের একটি সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মাঝে দক্ষিণ কোরিয়ার সিনোকোর (Sinokor) গ্রুপ, যারা বিশ্বের অননুমোদিত নৌবহরের প্রায় ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তারা ভাড়ার হার বৃদ্ধির কারণে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

এই সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছেন যে, ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইউক্রেন এখন ইরানের জন্য একটি বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। তিনি এই দাবির সপক্ষে জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেন। অন্যদিকে, আন্দ্রি কোভালেনকোর নেতৃত্বাধীন ইউক্রেনীয় সেন্টার ফর কাউন্টারিং ডিজইনফরমেশন জানিয়েছে যে, ২০২২ সাল থেকেই ইরান রাশিয়াকে বিপুল পরিমাণ 'শাহেদ' ড্রোন সরবরাহ করে আসছে, যা এই অঞ্চলের অস্থিরতাকে আরও উসকে দিচ্ছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, তাদের সামরিক অভিযান কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই অব্যাহত থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মার্ক হ্যালপেরিনের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে বর্তমানে প্রায় ৩০ দিনের একটি কৌশলগত সুযোগ রয়েছে, যার পরে এই যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যয় তার কৌশলগত অর্জনকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

10 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Clarin

  • Deutsche Welle

  • BBC

  • 9news

  • Daily Mail Online

  • Fox News

  • Deutsche Welle

  • Bloomberg Business

  • Deutsche Welle

  • UnoTV

  • Infobae

  • Primicias

  • 20Minutos

  • ФОНТАНКА.ру

  • Nfront

  • Украинская правда

  • inbusiness.kz

  • Ведомости

  • Ultimate Classic Rock

  • Loudwire

  • BLABBERMOUTH.NET

  • Revolver Magazine

  • Wikipedia

  • AP News

  • Hindustan Times

  • CHOSUNBIZ EN

  • Kurdistan24

  • The Guardian

  • 2026 Strait of Hormuz crisis - Wikipedia

  • Trump says U.S. struck Kharg Island, core of Iran's oil economy - The Washington Post

  • Fear in Trump World that Operation Epic Fury is at risk: MARK HALPERIN - ABDPost

  • 'Maximum disruption' in Strait of Hormuz as 16 vessels are hit during US-Israel war on Iran

  • US strikes more than 90 Iranian military targets on Kharg Island, CENTCOM says

  • HSToday

  • BBC News

  • WGI World

  • Institute for Strategic Dialogue

  • The Guardian

  • WANA (Mar 14) – Mohsen Rezaei, a member of Iran's Expediency Council, has taken a firm stance on regional security developments, stating that the Strait of Hormuz “will not reopen” and that a return to normal conditions in this strategic waterway depends on the fulfillment of specific conditions set by Iran.

  • Modern.az

  • CSIS

  • Maersk

  • Xclusiv

  • Teleprensa

  • Wikipedia, la enciclopedia libre

  • Clarín.com

  • SWI swissinfo.ch

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।